নবাবগঞ্জে ফসলি জমি কেটে নেওয়ার ঘটনা বেড়েছে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২৬
  • ৩ বার
নবাবগঞ্জে ফসলি জমি কেটে নেওয়ার ঘটনা বেড়েছে

প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকার নবাবগঞ্জে ঈদকে সামনে রেখে ফসলি জমির মাটি কেটে নেওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয় কৃষক ও ভূমিপ্রেমী মানুষদের অভিযোগ, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় রাতের আঁধারে একটি সংগঠিত চক্র কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি উত্তোলন করে ইটভাটাসহ বিভিন্ন নির্মাণকাজে সরবরাহ করছে। যদিও প্রশাসন নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান না থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।

স্থানীয়রা জানান, উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের মধ্যে কৈলাইল, চুড়াইন, শোল্লা, বাহ্রা, শিকারীপাড়া, নয়নশ্রী ও বান্দুরা এলাকায় মাটি কেটে নেওয়ার ঘটনা সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যায়। নদীর তীরবর্তী ও উর্বর ফসলি জমি পর্যন্ত রাতের আঁধারে খননযন্ত্র ব্যবহার করে কেটে নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে নয়নশ্রী ইউনিয়নের ভূরাখালী এলাকায় পরিবেশ আইন অমান্য করে জমির উপরিভাগের মাটি সরানো হচ্ছে। এতে কেবল জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে না, বরং প্রতিবেশী জমির স্থিতিশীলতাও হুমকির মুখে পড়ছে।

স্থানীয় কৃষিবিদ প্রদীপ সরকার বলেন, “জমির উপরের চার থেকে ছয় ইঞ্চি মাটিতেই সবচেয়ে বেশি পুষ্টি থাকে। এই স্তর কেটে নেওয়া হলে কৃষক অতিরিক্ত সার ব্যবহার করেও কাঙ্ক্ষিত ফসল পান না। এছাড়া মাটির এই নষ্ট হওয়া অংশ পরিবেশের ভারসাম্যও প্রভাবিত করে।”

ভূরাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশপাশের জমি ও অন্যান্য ফসলি মাঠে দেখা যায়, খননযন্ত্র বসিয়ে সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত মাটি উত্তোলন করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, প্রশাসনের অভিযান শেষ হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই আবারও মাটি কাটা শুরু হয়। এর ফলে ধীরে ধীরে ফসলি জমি গভীর খাদে পরিণত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কৃষকের আয় ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।

স্থানীয় কৃষক আবজাল হোসেন বলেন, “লিটন নামের এক ব্যক্তি নিয়মিত এই ফসলি জমির মাটি কেটে নিচ্ছেন। আমরা বারবার প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু কোনো রকম স্থায়ী সমাধান নেই। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে নিজেদের জমি বিক্রি করতে হচ্ছে।” স্থানীয়রা আরও জানান, এসব মাটি মূলত ইটভাটায় সরবরাহ করা হয়। তবে কিছু মাটি বিভিন্ন বসতবাড়ি ও ভরাট কাজে ব্যবহৃত হয়, যা স্থানীয় পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

নবাবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দিলরুবা ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে জানান, “এ বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। সম্প্রতি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে পাঁচজনকে সাজা দেওয়া হয়েছে এবং ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।” ইউএনও আরও উল্লেখ করেন যে, প্রশাসন সচেতন থাকলেও সম্পূর্ণ স্থায়ী সমাধান ছাড়া এই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি কেটে নেওয়া কৃষি উন্নয়নের জন্য মারাত্মক হুমকি। মাটি কাটার ফলে জমির উর্বরতা হারায়, পানি ধারণ ক্ষমতা কমে যায় এবং দীর্ঘমেয়াদে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়। এছাড়া স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রাতের আঁধারে মাটি কাটার ফলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যও ঝুঁকিতে পড়ছে।

নিয়মিত অভিযান এবং জরিমানা সত্ত্বেও, স্থানীয়রা জানান যে কার্যকর ও স্থায়ী সমাধানের অভাব রয়েই গেছে। তারা সরকার এবং প্রশাসনকে আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। স্থানীয় কৃষকরা মনে করেন, স্থানীয় কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সঠিক আইনি ব্যবস্থা ছাড়া এই সমস্যা দীর্ঘমেয়াদে সমাধান হবে না।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, “প্রতিটি কৃষিজমির উপরের মাটি কেটে নেওয়া না হলে ফসলের উর্বরতা বজায় থাকে এবং পরিবেশগত ভারসাম্যও রক্ষা পায়। প্রশাসন, কৃষক ও স্থানীয় কমিউনিটির সহযোগিতায় দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ ছাড়া এই ধরনের অনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব নয়।”

নবাবগঞ্জের পরিস্থিতি দেশের অন্যান্য এলাকায়ও এই ধরনের অনৈতিক মাটি উত্তোলনের সমস্যা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বহন করছে। স্থানীয়রা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, যদি এখনই স্থায়ী ও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে আগামী কয়েক বছরে ফসলি জমির উর্বরতা হ্রাস পাবে এবং কৃষকরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, রাতের আঁধারে মাটি কাটার এই চক্র শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ নয়, বরং স্থানীয় কৃষি ও পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলছে। তারা আশা করছেন প্রশাসন আরও কঠোর ও স্থায়ী পদক্ষেপ নেবে, যাতে কৃষকরা তাদের জমি নিরাপদে চাষ করতে পারেন এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকে।

এই ঘটনায় নবাবগঞ্জের ফসলি জমি, কৃষক এবং স্থানীয় জনগণের কল্যাণের জন্য একজোটভাবে সমাধান প্রয়োজন। কৃষি ও পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসন, স্থানীয় জনগণ এবং বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই ধরনের অনৈতিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত