প্রকাশ: ১৭ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাব বাংলাদেশের নির্মাণ ও আবাসন খাতে ইতিমধ্যেই দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বাজারে রড, সিমেন্ট, বালি, পাথর ও ইটসহ বিভিন্ন নির্মাণ সামগ্রীর দাম দ্রুত বেড়ে গেছে। বিশেষ করে মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে রডের দাম ১২ থেকে ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈশ্বিক অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে কাঁচামালসহ নির্মাণ সামগ্রীর দাম আরও বাড়তে পারে। বাজারে রডের দাম বৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। ৭৫ গ্রেডের রডের প্রতি টন দাম সংঘাত শুরুর আগে ৮০ থেকে ৮৩ হাজার টাকার মধ্যে ছিল, যা বর্তমানে ৯০ থেকে ৯৬ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ৬০ গ্রেডের রডের দামও প্রায় ১০ হাজার টাকা বেড়েছে। পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, রডের দাম এক সপ্তাহের ব্যবধানে ৮৯ থেকে ৯০ হাজার টাকার ওপরে উঠে গেছে।
মূল্যবৃদ্ধির পেছনে জাহাজ ভাড়া, কাঁচামাল সংকট এবং ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার অন্যতম কারণ। বাংলাদেশ অটো রি-রোলিং অ্যান্ড স্টিল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ মাসাদুল আলম মাসুদ জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে স্ক্র্যাপের দাম ৫০ থেকে ৬০ ডলার পর্যন্ত বেড়ে গেছে। স্থানীয় বাজারেও মজুত সীমিত এবং শিপ ব্রেকারের সংকটের কারণে শিল্প মালিকরাও কাঁচামাল আমদানি করতে পারছেন না।
সিমেন্ট, বালি, পাথর ও ইটের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। খুচরা বিক্রেতারা জানাচ্ছেন, বিভিন্ন কোম্পানি সিমেন্টের দাম বাড়াচ্ছে এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সরবরাহ সীমিত। এতে সাধারণ ক্রেতারা সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য পাচ্ছেন না।
রড-সিমেন্টসহ নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি আবাসন খাতকে প্রভাবিত করছে। রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর ভাইস-প্রেসিডেন্ট প্রকৌশলী আব্দুল লতিফ বলেন, “এ খাতে এক ধরনের বিপর্যয় চলছে। যুদ্ধের অজুহাতে পাথর, রড, সিমেন্ট ও ইটের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। কিন্তু ফ্ল্যাটের দাম বাড়ানো যাচ্ছে না। এতে কর্মসংস্থান ও খাতের স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়ছে।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্মাণ খাত দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। রড ও অন্যান্য কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধির কারণে ফ্ল্যাট নির্মাণে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, যা সাধারণ মানুষ ও বিনিয়োগকারীর জন্য চাপ সৃষ্টি করছে। মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে না থাকলে ভবিষ্যতে আবাসন খাতে সংকট দেখা দিতে পারে।
শিল্প মালিক ও ব্যবসায়ীরা সরকারের কাছে দাবী করছেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে পণ্য বা কাঁচামালের দাম বাড়লেও তা যেন অযৌক্তিক না হয়। পাশাপাশি পর্যাপ্ত কাঁচামাল মজুত এবং আমদানি সহজ করার বিষয়েও নজর দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন তারা।
এছাড়া, রডসহ নির্মাণ সামগ্রীর দাম বাড়ায় কেবল ব্যবসায়ীদেরই নয়, সাধারণ ক্রেতারাও প্রভাবিত হচ্ছে। নতুন ফ্ল্যাট ও ঘর নির্মাণে ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক পরিবার তাদের পরিকল্পনা স্থগিত করতে বাধ্য হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বৈশ্বিক অস্থিরতার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী না হলে ভবিষ্যতে নির্মাণ খাত আরও বেশি প্রভাবিত হতে পারে। তাই সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নিয়মিত নজরদারি এবং প্রয়োজনীয় নীতি গ্রহণ করতে হবে, যাতে মূল্যবৃদ্ধি স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রিত থাকে।
বাজারে রড-সিমেন্টসহ অন্যান্য নির্মাণ সামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় আবাসন খাতের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দাম বেড়ে গেলে ফ্ল্যাট নির্মাণে ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, যা সাধারণ মানুষের জন্য ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস করবে।
সামগ্রিকভাবে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা বাংলাদেশের আবাসন খাত ও নির্মাণ শিল্পে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। কাঁচামাল ও নির্মাণ সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে না থাকলে, এই খাতের সঙ্গে যুক্ত হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।