স্থানীয় সরকারে প্রশাসক নিয়োগে রাজনৈতিক বিতর্ক

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ, ২০২৬
  • ৪ বার

প্রকাশ: ১৭ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় প্রশাসক নিয়োগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দেশের ১১টি সিটি করপোরেশন ও ৪২টি জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার পর বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এ সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেছে। তাদের অভিযোগ, এসব পদে মূলত দলীয় নেতাদের ‘পুনর্বাসন’ করা হচ্ছে, যা স্থানীয় সরকারের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

সরকারি সূত্র অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯ এবং জেলা পরিষদ আইন, ২০০০ অনুযায়ী এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আইনে বলা আছে, বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে এবং তাঁদের দায়িত্বকাল সর্বোচ্চ ১৮০ দিন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও অনুরূপ পরিস্থিতিতে প্রশাসক নিয়োগের নজির রয়েছে। তবে বর্তমান সরকারের ক্ষেত্রে বিরোধীরা বলছে, দেশে স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন না দিয়ে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ায় সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে।

সর্বশেষ রোববার স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ৪২টি জেলা পরিষদে নতুন প্রশাসক নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করে। এর আগে জেলা প্রশাসকেরা এসব পরিষদের দায়িত্ব পালন করছিলেন। নিয়োগ পাওয়া প্রশাসকদের মধ্যে অন্তত ১০ জন আছেন, যাঁরা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে অংশগ্রহণ করে পরাজিত হয়েছেন। এদের মধ্যে কুড়িগ্রাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, রংপুর, গাইবান্ধা, বাগেরহাট, খুলনা, জয়পুরহাট ও ঝিনাইদহ অঞ্চলের কয়েকজন বিএনপি নেতা রয়েছেন। এ ছাড়া কুষ্টিয়া ও ভোলা জেলা পরিষদেও এমন ব্যক্তিদের প্রশাসক করা হয়েছে, যাঁরা দলীয় মনোনয়ন না পাওয়া বা রাজনৈতিক সমঝোতার কারণে নির্বাচনে অংশ নেননি।

জেলা পরিষদের পাশাপাশি দেশের সিটি করপোরেশনগুলোতেও একই ধারা লক্ষ্য করা গেছে। দ্বিতীয় দফায় বরিশাল, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, রংপুর ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে যাঁদের প্রশাসক করা হয়েছে, তাঁদের সবাই বিএনপির পদধারী নেতা। এর আগে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ ছয়টি সিটিতেও প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। এদের মধ্যে কেউ সংসদ নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন, কেউ দলীয় মনোনয়ন পাননি, আবার কেউ নির্বাচনী জটিলতার কারণে প্রার্থী হতে পারেননি।

বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতারা বলছেন, প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চলছে। তাঁদের দাবি, স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত হতো। কিন্তু প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে নির্বাচনের পথ বিলম্বিত করা হচ্ছে, যা ক্ষমতাসীন দলের জন্য রাজনৈতিক সুবিধা তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আইনি কাঠামোর মধ্যেই এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং স্থানীয় সরকারের কার্যক্রম সচল রাখাই এর উদ্দেশ্য। প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হলে উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে বলে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে। তাদের মতে, নির্বাচন আয়োজনের আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এবং প্রশাসনিক সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি।

স্থানীয় সরকার বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশাসক নিয়োগ একটি সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সালাহউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান মন্তব্য করেছেন, দলীয় ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিলে স্থানীয় সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তাঁর মতে, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় স্থানীয় সরকার নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়াই বেশি যুক্তিযুক্ত হতো।

এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জনগণের সরাসরি ভোটে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হলে স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা ও সেবা কার্যক্রমে জবাবদিহিতা বাড়ে। ফলে প্রশাসক নিয়োগ দীর্ঘায়িত হলে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে পারে।

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে জনগণের সরাসরি ভোটে প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে রাজনৈতিক মহলে। অনেকে মনে করছেন, দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে এই বিতর্কের অবসান হতে পারে।

সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকারে প্রশাসক নিয়োগের বিষয়টি এখন জাতীয় রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। সরকার, বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজ—সবার নজর এখন এ বিষয়ে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। নির্বাচন আয়োজনের সময়সূচি ও প্রশাসকদের দায়িত্বকাল কতটা সীমিত রাখা হয়, তা আগামী দিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত