হরমুজ সংকটে তেলের দাম বাড়ছে বিশ্ববাজারে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ, ২০২৬
  • ৫ বার
তেলের দাম বাড়ছে

প্রকাশ: ১৭ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা ও গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুট হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নিরাপত্তা অনিশ্চয়তার জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও বাড়তে শুরু করেছে অপরিশোধিত তেলের দাম। মঙ্গলবার এশিয়ার বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৩ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ড ডব্লিউটিআই তেলের দামও ২ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৯৬ ডলারের কাছাকাছি অবস্থান করছে। আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও অর্থনীতি বিষয়ক সংবাদমাধ্যম সিএনবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বিশ্ববাজারে তেলের দামের সাম্প্রতিক এই ওঠানামার পেছনে মূল কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তাকে। যুক্তরাষ্ট্র এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বহুজাতিক সামরিক জোট গঠনের আহ্বান জানিয়েছে। তবে মিত্র দেশগুলোর সবাই এতে ইতিবাচক সাড়া না দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা সতর্ক অবস্থানে চলে গেছেন এবং বাজারে দামের ওঠানামা অব্যাহত রয়েছে।

গত সপ্তাহেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০ ডলার পর্যন্ত উঠে যায়। পরে একদিনের ব্যবধানে তা ১০০ ডলারের নিচে নেমে এলেও আবার দ্রুত বাড়তে শুরু করে। এই অস্থিরতার কারণে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতির স্থায়িত্ব নিয়ে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফিরতে সময় লাগতে পারে।

জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এমএসটি মারকির বিশ্লেষক সল কেভনিক বলেন, যুদ্ধ কতদিন চলবে এবং পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে—এ বিষয়ে বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন বার্তা আসায় বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। তাঁর মতে, বিনিয়োগকারীরা এখন মূলত যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন, কারণ সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, ইরানের তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে মার্কিন প্রশাসন নৌপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিগগিরই এই বিষয়ে একটি বহুজাতিক জোট ঘোষণা করা হতে পারে। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, জোট গঠনের প্রক্রিয়া এখনো সম্পূর্ণ হয়নি এবং কিছু দেশ এতে অংশ নিতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে।

হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। ওমান ও ইরানের মাঝামাঝি অবস্থিত এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরল গ্যাস পরিবাহিত হয়। ২০২৫ সালে গড়ে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল এই পথে পরিবহন করা হয়েছে বলে তথ্য দিয়েছে বিভিন্ন জ্বালানি বিশ্লেষণ সংস্থা। সমুদ্রপথে বিশ্বে যত অপরিশোধিত তেল পরিবহন হয়, তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল।

আইএনজির পণ্যকৌশল বিভাগের প্রধান ওয়ারেন প্যাটারসন বলেছেন, তেল সরবরাহে এত বেশি বিঘ্ন ঘটছে যে দ্রুত কার্যকর সমাধান পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। বিমা সুরক্ষা, নৌবাহিনীর পাহারা কিংবা বিকল্প রুট ব্যবহারের মতো বিভিন্ন প্রস্তাব থাকলেও সেগুলো বাস্তবায়নে নানা ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে বাণিজ্যিক জাহাজ পাহারা দিতে গেলে নৌবাহিনী নিজেই হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা আইইএও সতর্ক করেছে যে হরমুজ প্রণালিতে চলমান সংকটের প্রভাব দ্রুত কাটবে না। সংস্থাটি জানিয়েছে, তেলের দাম স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনে সদস্যদেশগুলোর জরুরি মজুত থেকে আরও তেল বাজারে ছাড়া হতে পারে। আইইএর প্রধান ফাতিহ বিরোল বলেছেন, ইতোমধ্যে যে পরিমাণ তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বড় পদক্ষেপ। তবে পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অতিরিক্ত মজুত ব্যবহার করতে হতে পারে।

বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি শুধু জ্বালানি খাতেই নয়, খাদ্য, পরিবহন ও শিল্প উৎপাদনসহ নানা খাতে প্রভাব ফেলতে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। ফলে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সামরিক ও কূটনৈতিক পরিস্থিতি কীভাবে এগোয়, তা এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং নৌপথের নিরাপত্তা সংকট আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক উদ্যোগ, সামরিক সমন্বয় এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বাড়ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত