প্রকাশ: ১৯ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিউটি পার্লারগুলোতে এখন উপচে পড়া ভিড়। নিজেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করার আকাঙ্ক্ষা থেকে কিশোরী, তরুণী থেকে শুরু করে মধ্যবয়সী ও বয়স্ক নারীরাও ছুটছেন পার্লারে। উৎসবের আনন্দকে আরও রঙিন করে তুলতে সাজগোজের এই ব্যস্ততা যেন ঈদের আবহকেই নতুন মাত্রা দিয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ছোট-বড় প্রায় সব পার্লারেই সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ক্রেতাদের ভিড় লেগেই আছে। ফেসিয়াল, ফেয়ার পলিশ, গোল্ড ফেসিয়াল, ব্রণ ট্রিটমেন্ট, স্পা, মেনিকিউর ও পেডিকিউরসহ বিভিন্ন সেবা নিতে নারীদের দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সিরিয়াল পেতে আগেভাগেই বুকিং দিতে হচ্ছে, যা এই মৌসুমে পার্লার ব্যবসার চাহিদা কতটা বেড়েছে তা স্পষ্ট করে।
শুধু নারীরাই নন, ঈদের আগে সাজগোজে পিছিয়ে নেই তরুণরাও। রাজধানীর বিভিন্ন জেন্টস পার্লারেও দেখা গেছে সমান ভিড়। চুল কাটা, শেভ, ফেসিয়ালসহ নানা সেবা নিতে ছেলেদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। অনেকেই ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ও স্টাইলের দিকে বাড়তি মনোযোগ দিচ্ছেন, যা সাম্প্রতিক সময়ে একটি সামাজিক প্রবণতা হিসেবেই দেখা যাচ্ছে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত পার্লারগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, ক্রেতাদের সুবিধার্থে সকাল ৯টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত খোলা রাখা হচ্ছে। অনেক পার্লারে বাড়তি কর্মী নিয়োগ করা হয়েছে শুধুমাত্র ঈদের এই বাড়তি চাপ সামলানোর জন্য। তবুও গ্রাহকদের অপেক্ষার সময় কমানো যাচ্ছে না।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নীরব গাজী জানান, ঈদের আগে নিজেকে ফ্রেশ রাখতে তিনি চুল কাটার পাশাপাশি হারবাল ফেসিয়ালও করিয়েছেন। এসব সেবা নিতে তার খরচ হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা। তার মতে, ঈদের সময় নিজের প্রতি একটু বাড়তি যত্ন নেওয়া এখন একটি সাধারণ অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
ফার্মগেট এলাকার বাসিন্দা পলি খান বলেন, আগে তিনি বাসায় বসেই রূপচর্চা করতেন। তবে এখন কর্মব্যস্ততার কারণে সময়ের অভাব থাকায় পার্লারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তার মতে, পেশাদার সেবা নেওয়ার ফলে ত্বকের যত্নও ভালোভাবে নেওয়া সম্ভব হয়।
ধানমন্ডির রিমু মোজাম্মেল জানান, এবারের ঈদে নিজেকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করতে তিনি হেয়ার রিবন্ডিং করিয়েছেন। পাশাপাশি ফেসিয়াল, মেনিকিউর ও পেডিকিউর করার পরিকল্পনাও রয়েছে তার। এই পুরো প্রক্রিয়ায় তার খরচ পড়ছে কয়েক হাজার টাকা, যা তিনি ঈদের প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই দেখছেন।
পার্লারগুলোও এই সময়কে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অফার ও প্যাকেজ চালু করেছে। কোথাও হেয়ার রিবন্ডিংয়ের সঙ্গে ফেয়ার পলিশ ফ্রি দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও চুল কাটার সঙ্গে মেহেদি বা ফেসিয়ালের সঙ্গে ভ্রু-প্লাকিং বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে। এসব অফার গ্রাহকদের আকৃষ্ট করছে এবং ভিড় বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।
স্পা ও বিউটি থেরাপির ক্ষেত্রেও আগ্রহ বাড়ছে। ভেষজ স্পা, আয়ুর্বেদিক ট্রিটমেন্টসহ বিভিন্ন প্যাকেজ এখন বেশ জনপ্রিয়। দুই হাজার থেকে শুরু করে চার হাজার টাকার মধ্যে এসব সেবা পাওয়া যাচ্ছে, যা অনেকের জন্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
একটি বড় পার্লারের ব্যবস্থাপক রেশমা আক্তার জানান, ঈদের সময় প্রতিদিন কয়েকশ’ গ্রাহক সেবা নিতে আসছেন। তাদের চাহিদা মেটাতে কর্মীদের বাড়তি চাপ নিতে হচ্ছে। অনেক সময় গ্রাহকদের টিকিট কেটে লাইনে দাঁড়িয়ে সেবা নিতে হচ্ছে, যা এই মৌসুমের স্বাভাবিক চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কুইক ফেসিয়াল নামের একটি জনপ্রিয় সেবা রয়েছে, যা অনেক গ্রাহক নিয়মিত নিয়ে থাকেন। এটি কম সময়ে ত্বক সতেজ করতে সাহায্য করে এবং এর দামও তুলনামূলক কম হওয়ায় চাহিদা বেশি।
মেহেদি দেওয়ার ক্ষেত্রেও সব বয়সী নারীদের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। ঈদের আগের দিনগুলোতে পার্লারগুলোতে হাত রাঙাতে ভিড় আরও বেড়ে যায়। অনেকেই আগে থেকেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে রাখছেন যাতে শেষ মুহূর্তের ভিড় এড়ানো যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, নগরজীবনের ব্যস্ততা এবং সৌন্দর্যচর্চায় সচেতনতা বাড়ার কারণে পার্লার নির্ভরতা দিন দিন বাড়ছে। ঈদের মতো বড় উৎসবগুলো এই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সাজগোজের নানা ট্রেন্ড ছড়িয়ে পড়ায় মানুষ আগের চেয়ে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ঈদকে ঘিরে পার্লার সংস্কৃতি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। এটি শুধু সৌন্দর্যচর্চার বিষয় নয়, বরং উৎসবের আনন্দকে আরও উপভোগ করার একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।