প্রকাশ: ১৯ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে রাজধানীজুড়ে শুরু হয়েছে ঘরমুখো মানুষের ঢল। ভোর হতেই বাস, ট্রেন ও লঞ্চ টার্মিনালগুলোতে দেখা গেছে উপচে পড়া ভিড়। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে লাখো মানুষ ঢাকা ছাড়ছেন, যার ফলে দেশের প্রধান পরিবহন কেন্দ্রগুলোতে সৃষ্টি হয়েছে চাপ ও ব্যস্ততা।
বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) ভোর থেকে রাজধানীর বিভিন্ন পরিবহন পয়েন্টে সরেজমিনে দেখা যায়, দূরপাল্লার বাসগুলো নির্ধারিত সময়েই ছেড়ে যাচ্ছে। গাবতলী বাস টার্মিনালে যাত্রীদের ভিড় থাকলেও অনেকেই সময়মতো বাস পেয়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। তবে কিছু যাত্রী অভিযোগ করেছেন, নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা আদায় করা হচ্ছে। যদিও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
যাত্রীদের পাশাপাশি পরিবহন মালিক ও চালকরাও ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন। জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে অনেক সময় ফিলিং স্টেশন ঘুরে তেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে, যা সময় নষ্ট করছে এবং সময়সূচিতে প্রভাব ফেলছে। এতে কিছু ক্ষেত্রে যাত্রা শুরুর সময় বিলম্বিত হচ্ছে বলে জানা গেছে।
রাজধানী থেকে বের হওয়া বিভিন্ন মহাসড়কে যাত্রী ও যানবাহনের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে গাজীপুরের চন্দ্রা মোড় এলাকায় কয়েক কিলোমিটারজুড়ে যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। পথে পথে যাত্রী ওঠানো এবং অতিরিক্ত যানবাহনের চাপের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। অনেক যাত্রী ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও বাস পাচ্ছেন না।
পরিস্থিতির চাপে পড়ে অনেকেই বিকল্প উপায়ে বাড়ি ফিরছেন। বাস না পেয়ে বা বাড়তি ভাড়া দিতে না চেয়ে অনেকে ট্রাক, পিকআপ কিংবা অন্যান্য অনিরাপদ যানবাহনে করেই রওনা হয়েছেন। পরিবার, নারী ও শিশুদের নিয়ে এমন ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা তাদের জন্য বাড়তি দুর্ভোগ তৈরি করছে।
এদিকে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনেও দেখা গেছে উপচে পড়া ভিড়। ভোর থেকেই হাজারো যাত্রী স্টেশনে ভিড় জমিয়েছেন। বেশ কয়েকটি ট্রেন নির্ধারিত সময়ের তুলনায় ১০ থেকে ১৫ মিনিট দেরিতে ছেড়ে গেছে। সকাল পর্যন্ত অন্তত সাতটি ট্রেন বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়।
ঈদের মাত্র দুই দিন বাকি থাকায় অনেক যাত্রী যে যেভাবে পারছেন বাড়ি ফিরছেন। কেউ টিকিট নিয়ে, কেউবা টিকিট ছাড়াই ট্রেনের ছাদে উঠে যাত্রা করছেন। এতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়লেও তাতে ভ্রুক্ষেপ নেই অনেকেরই। পরিবারের সঙ্গে ঈদ কাটানোর আকাঙ্ক্ষাই যেন সবকিছুকে ছাপিয়ে যাচ্ছে।
এর মধ্যে আগের দিন বগুড়ার সান্তাহারে একটি ট্রেন দুর্ঘটনার কারণে কিছু রুটে যাত্রীদের অতিরিক্ত ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করলেও এতে সময় বেশি লাগছে।
নৌপথেও একই চিত্র। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে ভোর রাত থেকেই যাত্রীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। লঞ্চে উঠতে অনেককে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। পন্টুনে লঞ্চ ভিড়তেই যাত্রীরা হুড়োহুড়ি করে ওঠার চেষ্টা করছেন, যা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে।
যাত্রীতে পরিপূর্ণ হলেই লঞ্চগুলো ছেড়ে যাচ্ছে। নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকলেও অনেকেই তা উপেক্ষা করে যাত্রা করছেন। যাত্রীদের ভাষায়, কিছুটা কষ্ট হলেও পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের আনন্দই তাদের কাছে বড়। তুলনামূলকভাবে আরামদায়ক হওয়ায় অনেকেই লঞ্চ ভ্রমণকে পছন্দ করছেন।
তবে লঞ্চ ভাড়া নিয়েও রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ কেউ বলছেন ভাড়া সহনীয়, আবার অনেকে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। তবুও শেষ মুহূর্তে বাড়ি ফেরার তাড়নায় অধিকাংশ যাত্রীই এসব বিষয় মেনে নিচ্ছেন।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, ঈদযাত্রা ঘিরে দেশের পরিবহন ব্যবস্থায় একদিকে যেমন চাপ বেড়েছে, অন্যদিকে মানুষের আবেগ ও প্রত্যাশাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নানা সীমাবদ্ধতা, ভোগান্তি এবং ঝুঁকি সত্ত্বেও প্রিয়জনের কাছে ফিরতে মানুষের এই ছুটে চলা যেন বাঙালির চিরন্তন উৎসবচিত্রেরই প্রতিফলন।