প্রকাশ: ১৯ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
টলিউডের অপরাজেয় অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত কেরিয়ারের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত নিজেকে কেবলমাত্র ‘সুন্দর মুখ’ হিসেবেই বিবেচিত হতে চাননি। দীর্ঘকাল চলা এই শিল্পজীবনে তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন, শুধু সৌন্দর্য নয়, চরিত্রের গভীরতা এবং গল্পের আবহ টানতে পারাই তার আসল লক্ষ্য। সম্প্রতি পরিচালক অরিন্দম শীল থ্রিলার ছবি ‘কর্পূর’ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অভিনেত্রী নিজেই তার এই অবস্থান পরিষ্কার করেছেন।
ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত জানান, ‘সব সময় দেখতে সুন্দর লাগবে এমন কোনো বাসনা তার নেই।’ তিনি বলেন, ‘আমি একজন অভিনেত্রী, আমার কাছে চরিত্রই শেষ কথা।’ এই বক্তব্যে বোঝা যায়, টলিউডে ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিজস্ব অবস্থান বজায় রাখা এ নায়িকাকে কেবল অভিনয় দিয়ে দর্শকের সঙ্গে একটি সম্পর্ক গড়ে তুলতে ভালো লাগে।
জীবনের বিভিন্ন ধাপ ও বিভিন্ন চরিত্রে নিজেকে দিয়েছেন ঋতুপর্ণা। ‘আলো’ থেকে ‘রাজকাহিনী’— প্রতিটি ছবিতে তিনি নিজেকে ভেঙেছেন, নতুন করে নিজেকে সাজিয়েছেন। এবার ‘কর্পূর’ ছবিতে তাকে দেখা যাবে একজন কলেজের দৃঢ়চেতা অধ্যাপিকার ভূমিকায়, যেখানে মেকআপ বা বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়েও ব্যক্তিত্ব এবং চরিত্রের গভীরতা কাজ করবে। এই পরিবর্তিত, বাস্তবসম্মত ও শক্তিশালী চরিত্র দর্শকদের সামনে তাকে এক নতুন আয়ামে উপস্থাপন করবে বলে প্রত্যাশা ফেব্রুয়ারির দিকে মুক্তি পেতে যাওয়া এই ছবির প্রতিশ্রুত থেকে।
চলচ্চিত্রের কাজের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনের দিকেও ঋতুপর্ণার দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত বাস্তব ও মানবিক। দুই সন্তানের মা হওয়ার পরেও তিনি নিজেকে পুরোপুরি শুধুই ক্যামেরার সামনে আবদ্ধ করেননি। তাঁর ক্ষেত্রে কাজ এবং পরিবার— এই দুই দিকই সমান গুরুত্ব পায়। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সব কিছুর দায়িত্ব আমাকে নিতে হয়। আমি কাজও করতে চেয়েছি আবার সংসারও। এই পরিশ্রমটা মানুষ বাইরে থেকে বুঝতে পারবে না।’
একজন মা, স্ত্রীর রূপে তিনি যে শুধুই রূপবতী নন বরং জীবনের বিভিন্ন দিক মোকাবেলা করে যাওয়ার শক্তিও besitzen করেন, তা তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে প্রতিফলিত হয়। সংযোগ ও ঘনিষ্ঠতার গুরুত্ব বেশ বোঝেন তিনি। তাই শত ব্যস্ততার মাঝেও তিনি স্বামী সঞ্জয় চক্রবর্তীকে সময় দিতে ভুলেন না। কাজের চাপের পাশাপাশি পরিবারকে সময় দেওয়া তাঁর কাছে অগ্রাধিকার। রোম্যান্স টিকিয়ে রাখা এবং জীবনের সান্নিধ্য— এই দুটোই তাঁর কাছে অত্যন্ত জরুরি।
নিজেকে প্রতিদিন নতুনভাবে খুঁজে পাওয়া এবং শিল্পজগতের নানা উঠোনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা— এ পথ সহজ ছিল না ঋতুপর্ণার জন্য। দীর্ঘ সময় ধরে চলচ্চিত্র জগতে আবির্ভূত এই অভিনেত্রী বলছেন, শিল্পের কোন্দল বা ছোট গণ্ডির রাজনীতি থেকে নিজেকে দূরে রাখতে চেয়েছেন তিনি। শিল্পী জীবনে শক্তি ও মানসিক স্থিরতা যেগুলো প্রয়োজন— তা অর্জনের পথও কঠিন। এই কঠিন পথেই তিনি নিজেকে আবদ্ধ করেছেন বাস্তব গল্প, শক্ত চরিত্র এবং মানুষের অনুভূতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে।
ঋতুপর্ণার মতে, সিনেমা কোনো নির্দিষ্ট ‘হাউস’ বা গোষ্ঠীর কুক্ষিগত দলে সীমাবদ্ধ হওয়া উচিত নয়। তিনি মনে করেন, ইন্ডাস্ট্রিকে বড় ও সমৃদ্ধ করতে হলে উদার মানসিকতা প্রয়োজন। উদার মানসিকতার মাধ্যমে নতুন প্রতিভা আলোচনায় আসে, নতুন গল্প সুযোগ পায়, বিভিন্ন দর্শক শ্রেণি ও বয়সের মানুষের মন জয় করে নানা রকম চরিত্র ও গল্প তাদের কাছে পৌঁছায়।
যে শিল্পী দর্শকের সামনে আবির্ভূত হয়, তাঁর দায়িত্ব শুধু সুন্দর দেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়— এটা বারবারই ঋতুপর্ণা প্রমাণ করেছেন। তিনি এমন একটি দর্শন পোষণ করেন যেখানে চরিত্রের গভীরতা, গল্পের গতিশীলতা, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং পেশাগত নীতির সম্মিলিত ছবি ফুটে ওঠে। দর্শক শুধু চোখে নয়, মনে অনুভব করেন এমন শিল্পীকে আরও সমৃদ্ধ করে।
‘কর্পূর’ ছবিতে তাঁর অভিনীত দৃঢ়চেতা অধ্যাপিকা চরিত্রটি এমনই এক বাস্তবতাবোধপূর্ণ চরিত্র, যে চরিত্র দর্শককে ভাবতে বাধ্য করবে— একটি শক্তিশালী নারীর ভেতরের সংগ্রাম, দৃঢ়তা এবং বাস্তব জীবনের সঙ্গে সিনেমার সংযোগ কীভাবে ঘটতে পারে। মেকআপ বা বাহ্যিক রূপ নয়; ব্যক্তিত্ব ও চরিত্রের প্রতিবাদী শক্তি— এই সব টুকুই ছবির আসল শক্তি।
টলিউডের দর্শক যেমন ঋতুপর্ণাকে গ্ল্যামারাস নায়িকা হিসেবেও দেখে এসেছে, তেমনি তিনি নিজেও তার কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত মূল্যবোধ ও চরিত্রের গুরুত্বে দৃঢ় ছিলেন। সেই সঙ্গে তিনি বিশ্বাস করেন, একজন শিল্পীর কাছে তার কাজের গতিশীলতা, মানবিক বোধ এবং সমাজের বাইরে না থেকে মানুষের অনুভূতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করাই আসল অর্জন।
এভাবেই দীর্ঘ সময় ধরে ঋতুপর্ণা নিজের কাজকে দর্শকের কাছে তুলে ধরেছেন— কঠোর পরিশ্রম, বাস্তব চরিত্রচর্চা এবং শিল্পের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিয়ে। সেই কারণেই আজও বহু প্রজন্মের দর্শক তাঁকে অভিনয়ের এক অনন্য প্রতিভা হিসেবে স্মরণ করেন।
‘সৌন্দর্য সব সময় চোখে ধরা লাগবে না— তবে একজন শিল্পীর চরিত্রের গভীরতা হৃদয়ে জায়গা করে নেবে’— এই কথাটিই ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তের কথায় সবথেকে বড় শিক্ষা হয়ে ওঠে। তিনি দর্শকদের সামনে শুধু একজন নায়িকা হিসেবেই নেই, বরং একজন শিল্পী, মা, স্ত্রী, সমাজচেতনা সম্পন্ন নারী— এই সব রূপেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
সিনেমার পর্দায় ও জীবনের বাস্তবে একসঙ্গে এই ভাবনার মিলন ঘটাতে পারাই তিনি আজ টলিউডের অন্যতম ক্ষমতাশালী অভিনেত্রী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। তাঁর এই দর্শন শুধু শিল্পী নয়, সমাজের প্রতিটি মানুষের কাছে একটি অনুপ্রেরণা রূপে কাজ করবে।
ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত অভিনয়ে ‘কর্পূর’ সিনেমা আরও একবার দর্শকদের সামনে নিয়ে আসবে সেই শক্ত চরিত্র, যার ভিতর দেখতে মিলবে বাস্তব নারীর সংগ্রাম, দৃঢ়চিত্ততা এবং জীবনের নানা দিকের প্রতিফলন— এমনটাই অনুমোদন করছেন সংশ্লিষ্ট শিল্পবিশেষজ্ঞ ও ছবিটি দেখাসহ আলোচনায় আসা দর্শকরাও।
এভাবেই একজন শিল্পী নিজের বাস্তব দর্শন ও চরিত্রভিত্তিক আস্থার মাধ্যমে আজও দর্শকের মনে বিশেষ স্থান করে নিচ্ছেন— সৌন্দর্য নয়, চরিত্রই তার আসল পরিচয়।