ইরানি তেলে শিথিলতা, এশিয়ায় সরবরাহ বাড়ার ইঙ্গিত

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২১ মার্চ, ২০২৬
  • ২ বার
ইরানি তেলে শিথিলতা

প্রকাশ: ২১ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন এক মোড়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। সমুদ্রপথে ইরানি তেল কেনার ওপর ৩০ দিনের জন্য নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন। এই সিদ্ধান্তের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল সরবরাহ বাড়তে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে এশিয়ার জ্বালানি নির্ভর অর্থনীতিগুলোর জন্য এটি বড় ধরনের স্বস্তির বার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, এই সাময়িক শিথিলতার ফলে প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ব্যারেল ইরানি তেল বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশ করতে পারে। যদিও এই তেল সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করবে কি না, সে বিষয়ে এখনও কোনো স্পষ্টতা নেই। তবে তার বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তেল সরবরাহ বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখাই এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য।

বেসেন্ট আরও বলেন, এই নীতির মাধ্যমে একদিকে যেমন বাজারে সরবরাহ বাড়ানো হবে, অন্যদিকে ইরান যাতে তেল বিক্রি থেকে সরাসরি আর্থিক সুবিধা নিতে না পারে, সে দিকেও নজর রাখা হচ্ছে। তার ভাষায়, ‘ইরানের তেলই আমরা ব্যবহার করব তেহরানের বিরুদ্ধে।’ একইসঙ্গে তিনি জানান, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে চলমান কৌশলগত কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

এই শিথিলতা সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। কিউবা, উত্তর কোরিয়া এবং ক্রিমিয়া এই সুবিধার আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। নীতিটি কার্যকর থাকবে আগামী ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত, যা স্বল্পমেয়াদি হলেও এর প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী।

এশিয়ার বাজারে এই সিদ্ধান্তের প্রভাব নিয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট জানিয়েছেন, সরবরাহ খুব দ্রুতই এশিয়ায় পৌঁছাতে পারে। তার মতে, তিন থেকে চার দিনের মধ্যেই প্রথম চালান গন্তব্যে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে এবং পরবর্তী দেড় মাসের মধ্যে পরিশোধন শেষে তা বাজারে প্রবেশ করবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারে চীন। দেশটির স্বাধীন রিফাইনারি প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরেই তুলনামূলক কম দামে ইরানি তেল কিনে আসছে। পাশাপাশি ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ইতালি, গ্রিস, তাইওয়ান এবং তুরস্ক অতীতে ইরানি তেলের বড় ক্রেতা ছিল। ফলে এই দেশগুলোর জন্যও নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ভারতের কয়েকটি বড় রিফাইনারি ইতোমধ্যে ইরানি তেল কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে তারা এখনো সরকার ও ওয়াশিংটনের দিকনির্দেশনা এবং নিরাপদ অর্থ পরিশোধ পদ্ধতির অপেক্ষায় রয়েছে। একই পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে এশিয়ার অন্যান্য দেশেও, যেখানে আইনি ও প্রযুক্তিগত বিষয়গুলো যাচাই না করে বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে না প্রতিষ্ঠানগুলো।

বর্তমানে সমুদ্রপথে বিপুল পরিমাণ ইরানি তেল মজুত রয়েছে। জ্বালানি বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যমতে, প্রায় ১৩ থেকে ১৭ কোটি ব্যারেল তেল বিভিন্ন জাহাজে ভাসমান অবস্থায় রয়েছে। এই বিশাল মজুত দ্রুত বাজারে প্রবেশ করলে সরবরাহ চেইনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

এশিয়ার দেশগুলো তাদের মোট তেলের চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। এই প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হওয়ায় এর অচলাবস্থা সরাসরি প্রভাব ফেলছে বৈশ্বিক বাজারে।

শোধনাগারগুলোকেও পড়তে হচ্ছে নানা সমস্যায়। অনেক তেল পুরোনো ও অনিবন্ধিত জাহাজে সংরক্ষিত থাকায় তা দ্রুত বাজারে আনা সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি ব্যাংকিং জটিলতা এবং প্রশাসনিক অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা তেল কেনাবেচার প্রক্রিয়াকে আরও কঠিন করে তুলছে। যারা সরাসরি ন্যাশনাল ইরানি অয়েল কোম্পানি থেকে তেল কিনতেন, তাদের বিদ্যমান চুক্তির শর্তও একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জ্বালানি বিশ্লেষক ব্রেট এরিকসন মনে করেন, এই সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক পরিস্থিতির একটি গভীর সংকেত বহন করে। তার মতে, যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যেখানে প্রতিপক্ষ দেশের ওপরই নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে হয়, তাহলে বোঝা যায় বিকল্প পথ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।

এদিকে ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতার প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে সরবরাহ বাড়ানোর মাধ্যমে মূল্য নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা হলেও বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালী স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বড় ধরনের পরিবর্তন আশা করা কঠিন।

সব মিলিয়ে, ইরানি তেলের ওপর এই সাময়িক শিথিলতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। এটি যেমন বাজারে স্বস্তি আনতে পারে, তেমনি ভূরাজনৈতিক সমীকরণেও নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বোঝা যাবে, এই সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হয় এবং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কোন দিকে গড়ায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত