প্রকাশ: ২২ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কুমিল্লার পদুয়ারবাজার রেলক্রসিংয়ে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনার পর পাঁচ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর অবশেষে চট্টগ্রামের সঙ্গে সারাদেশের রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়েছে। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধার তৎপরতা জোরদার হলে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে থাকে পরিস্থিতি। তবে এই স্বাভাবিকতার পেছনে লুকিয়ে আছে এক গভীর শোক, যা ছুঁয়ে গেছে বহু পরিবারকে।
রোববার সকাল প্রায় ৮টার দিকে দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায় রেলওয়ের রিলিফ ট্রেন। দ্রুততার সঙ্গে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ঢাকাগামী মেইল ট্রেনটি সরিয়ে নেওয়া হয়। একইসঙ্গে রেললাইনে আটকে থাকা দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া বাসটিকেও সরানো হয়। এরপরই পুনরায় চালু হয় ট্রেন চলাচল, স্বস্তি ফিরে আসে ব্যস্ত এই রুটে।
রেলওয়ের চট্টগ্রাম বিভাগের ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, রাতভর কাজ চালিয়ে যাওয়ার ফলে দ্রুত সময়ের মধ্যেই রেলপথ সচল করা সম্ভব হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, দুর্ঘটনার প্রভাব ছিল ব্যাপক এবং পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ছিল চ্যালেঞ্জিং।
এর আগে শনিবার দিবাগত রাত প্রায় ৩টার দিকে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ারবাজার এলাকায় ঘটে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী একটি ট্রেনের সঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে চট্টগ্রামগামী ‘মামুন স্পেশাল’ পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসের সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষ এতটাই ভয়াবহ ছিল যে দ্রুতগতির ট্রেনটি বাসটিকে প্রায় এক কিলোমিটার পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়।
দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে চিৎকার, কান্না আর উদ্ধারকর্মীদের তৎপরতায় ভরে ওঠে পুরো এলাকা। শুরুতে কয়েকজনের মরদেহ উদ্ধার করা হলেও সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে নিহতের সংখ্যা। সর্বশেষ পাওয়া তথ্যে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ জনে, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে।
খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায় পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় উদ্ধার করা হয় হতাহতদের। আহতদের পাঠানো হয় কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ, যেখানে তাদের চিকিৎসা চলছে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে তখন ছিল এক করুণ দৃশ্য—স্বজন হারানোর আহাজারি আর আহতদের যন্ত্রণার মিশ্র প্রতিধ্বনি।
হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. অজয় ভৌমিক জানান, এখন পর্যন্ত ১২ জনের মরদেহ হাসপাতালে আনা হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনের পরিচয় শনাক্ত করা গেলেও বাকিদের পরিচয় নিশ্চিত করতে কাজ চলছে।
দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে ইতোমধ্যে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। ট্রেনের যাত্রী এবং স্থানীয়দের অভিযোগ, রেলগেটের সিগন্যালম্যানের অবহেলার কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। তাদের দাবি, যথাসময়ে সতর্ক সংকেত দেওয়া হয়নি, ফলে বাসটি রেললাইনে উঠে পড়ে।
এছাড়া জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করেও দ্রুত সাড়া না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন অনেকেই। এই বিষয়টি নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। তারা বলছেন, দুর্ঘটনার পর দ্রুত সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া গেলে হয়তো ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা কমানো যেত।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কর্মকর্তা মো. ইদ্রিস প্রাথমিকভাবে জানিয়েছেন, রেলক্রসিংয়ে যথাযথ সিগন্যাল না থাকাই দুর্ঘটনার একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে তদন্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে।
এই ঘটনার পরপরই কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসেছে। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে রেলওয়ে ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করছেন।
দুর্ঘটনার প্রভাবে কয়েক ঘণ্টার জন্য চট্টগ্রামের সঙ্গে সারাদেশের রেল যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এতে ভোগান্তিতে পড়েন শত শত যাত্রী। কেউ গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেননি সময়মতো, কেউ আবার স্টেশনে অপেক্ষা করেছেন অনিশ্চয়তার মধ্যে।
বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেল রুট হওয়ায় এই লাইনে প্রতিদিন অসংখ্য যাত্রী ও পণ্য পরিবহন হয়। ফলে এমন দুর্ঘটনা শুধু প্রাণহানিই নয়, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও সাময়িক প্রভাব ফেলে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই দুর্ঘটনা আবারও রেলক্রসিং নিরাপত্তার দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরেই অরক্ষিত রেলক্রসিংগুলো নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি ছিল।
কুমিল্লার এই ট্র্যাজেডি সেই পুরোনো প্রশ্নগুলোকে নতুন করে উসকে দিয়েছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, সিগন্যালিং উন্নয়ন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি—সবকিছু মিলিয়েই প্রয়োজন একটি সমন্বিত উদ্যোগ।
পাঁচ ঘণ্টা পর রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক হওয়া নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। তবে সেই স্বস্তি আড়াল করতে পারছে না দুর্ঘটনার গভীর ক্ষত। এখন সবার প্রত্যাশা, এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হবে এবং ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।