প্রকাশ: ২২ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দক্ষিণ কলকাতার পুরোনো জনপদ ভবানীপুর এখন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত কেন্দ্র। সংকীর্ণ গলি, ব্যস্ত বাজার আর ইতিহাসে ভরপুর এই এলাকা যেন নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়াচ্ছে। কারণ একটাই—এখানেই আবার মুখোমুখি হয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শুভেন্দু অধিকারী।
২০২১ সালের নন্দীগ্রাম-এর সেই উত্তপ্ত লড়াই যেন আবার ফিরে এসেছে, শুধু মঞ্চ বদলেছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা, কৌশল আর প্রতীকী শক্তির লড়াই একই রয়ে গেছে। ফলে ভবানীপুর এখন শুধু একটি বিধানসভা আসন নয়, বরং দুই রাজনৈতিক শক্তির মর্যাদার লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
নির্বাচনী প্রচারের শুরুতেই দুই নেতার কৌশলে ছিল মিল। শুভেন্দু অধিকারী প্রচার শুরু করেন কালীঘাট কালীমন্দির-এ পূজা দিয়ে। কিছু সময় পর একই পথে হাঁটেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। সন্ধ্যায় বগলামুখী মন্দির-এ পূজা দিয়ে তিনিও প্রচার শুরু করেন।
এই ধর্মীয় আচার শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাসের প্রকাশ নয়, বরং ভোটের আগে এক ধরনের প্রতীকী বার্তা। ভোটারদের কাছে নিজেদের অবস্থান দৃঢ়ভাবে তুলে ধরার কৌশল হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।
নন্দীগ্রামে ২০২১ সালের নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়ে বড় রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। সেই জয় ছিল পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি বড় মোড়। তবে পরবর্তীতে ভবানীপুর উপনির্বাচনে জয় পেয়ে মুখ্যমন্ত্রীর পদ ধরে রাখেন মমতা।
এবার সেই ভবানীপুরেই আবার দুই নেতার মুখোমুখি লড়াই, যা স্বাভাবিকভাবেই বাড়িয়ে দিয়েছে উত্তেজনা। শুধু তাই নয়, শুভেন্দু অধিকারী এবার নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর—দুটি আসনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা তার রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাসেরই প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পুরো পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে এখন নির্বাচনী উত্তাপ তুঙ্গে। শাসক তৃণমূল কংগ্রেস প্রায় সব আসনেই প্রার্থী দিয়েছে। অন্যদিকে বিজেপি, বামফ্রন্ট ও অন্যান্য দলও নিজেদের শক্তি প্রদর্শনে মাঠে নেমেছে। তবে এই বিস্তৃত লড়াইয়ের মধ্যেও ভবানীপুর আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে।
এর অন্যতম কারণ এই আসনের জটিল ভোট সমীকরণ। এখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অবাঙালি ভোটার রয়েছেন, যাদের বড় একটি অংশ বিজেপির দিকে ঝুঁকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি মুসলিম ভোটারদের একটি বড় অংশ তৃণমূলের পক্ষে যেতে পারে।
ভবানীপুরে বস্তি এলাকা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত আবাসন। এই বহুমাত্রিক ভোটার কাঠামোই আসনটিকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলেছে। বিশেষ করে বহুতলবাসীদের ভোটদানের হার যদি বাড়ে, তবে ফলাফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভোটার তালিকা সংশোধনের বিষয়টি। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মৃত বা অস্তিত্বহীন ভোটারের নাম বাদ পড়ায় ভুয়া ভোটের সুযোগ কমে যাচ্ছে। ফলে এবার নির্বাচনে স্বচ্ছতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারকে আরও তীব্র করতে মাঠে নামছেন জাতীয় পর্যায়ের নেতারাও। নরেন্দ্র মোদি আবারও পশ্চিমবঙ্গে প্রচারে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এর আগে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড-এ বড় সমাবেশ করেছেন তিনি।
তার পাশাপাশি বিজেপির শীর্ষ নেতা অমিত শাহ, জে পি নাড্ডা, যোগী আদিত্যনাথ এবং মিঠুন চক্রবর্তী-রাও প্রচারে অংশ নেবেন। ফলে ভবানীপুরে রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসও আত্মবিশ্বাসী। দলটির দাবি, তারা টানা চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করবে এবং আগের নির্বাচনের চেয়েও বেশি আসন পাবে।
বিজেপির পক্ষ থেকে পাল্টা দাবি করা হচ্ছে, এবার পশ্চিমবঙ্গে ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকার গঠিত হবে। অর্থাৎ কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।
এই পাল্টাপাল্টি দাবির মধ্যেই জমে উঠেছে নির্বাচনী লড়াই। শহর থেকে মফস্বল—সব জায়গায় পোস্টার, ব্যানার আর দেয়াললিখনে ছড়িয়ে পড়েছে নির্বাচনের রঙ।
তবে সব কিছুর কেন্দ্রে এখন ভবানীপুর। এখানে প্রতিটি গলি, প্রতিটি মোড় যেন দুই নেতার লড়াইয়ের গল্প বলছে।
এই লড়াই কেবল একটি আসনের জন্য নয়, বরং রাজনৈতিক প্রভাব, প্রতীকী শক্তি এবং ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার লড়াই। তাই ফলাফল যাই হোক না কেন, ভবানীপুরের এই নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন প্রভাব ফেলবে—এমনটাই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।