প্রকাশ: ২৩ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঈদের আনন্দ ধীরে ধীরে স্তিমিত। গ্রামবাংলার উঠোনে যে হাসি কয়েকদিন আগে ভেসে উঠেছিল, তা এখন বিদায়ের আবহে নরম হয়ে আসছে। সেই আবেগ বুকে নিয়েই কর্মব্যস্ত জীবনে ফিরতে শুরু করেছেন রাজধানীমুখী মানুষ। দেশের দক্ষিণাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ঢাকায় ফেরা যাত্রীদের উপস্থিতিতে আবারও সরগরম হয়ে উঠেছে Sadarghat Launch Terminal।
সোমবার ভোরের আলো ফোটার আগেই টার্মিনাল এলাকায় দেখা যায় কর্মজীবী মানুষের ঢল। একের পর এক লঞ্চ এসে ভিড়ছে ঘাটে। ক্লান্ত কিন্তু তৃপ্ত মুখে যাত্রীরা নামছেন। কারও হাতে ব্যাগ, কারও কাঁধে পরিবারের জন্য আনা উপহার। চোখে এক ধরনের মিশ্র অনুভূতি—ছুটি শেষ হওয়ার কষ্ট, আবার কাজের টানে ফেরার বাস্তবতা।
এবারের ঈদযাত্রা নিয়ে যাত্রীদের অভিজ্ঞতা তুলনামূলক ইতিবাচক। দীর্ঘ ছুটি থাকায় তাড়াহুড়া কম ছিল, চাপও কমেছে বলে জানান অনেকে। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটানোর সুযোগ পেয়েছেন তারা। ফলে ফেরার সময় মানসিকভাবে অনেকটাই হালকা অনুভব করছেন। যাত্রাপথেও তেমন ভোগান্তি না থাকায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন অধিকাংশ মানুষ।
বরিশাল থেকে আসা এক বেসরকারি চাকরিজীবী বলেন, এবারের ঈদে প্রায় এক সপ্তাহ গ্রামের বাড়িতে ছিলেন। এমন সুযোগ সবসময় পাওয়া যায় না। তাই সময়টা খুব উপভোগ করেছেন। এখন আবার কাজের টানে ফিরতে হচ্ছে, তবে মনটা বেশ সতেজ লাগছে। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন খুলনা ও পটুয়াখালী থেকে ফেরা আরও অনেক যাত্রী।
লঞ্চযাত্রা বরাবরই দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য প্রধান ভরসা। নদীপথের এই যাত্রা শুধু পরিবহন নয়, বরং এক ধরনের অনুভূতিরও অংশ। ঈদের সময় সেই অনুভূতি আরও গভীর হয়। নদীর বুকে দীর্ঘ যাত্রা শেষে যখন রাজধানীর ব্যস্ততা চোখে পড়ে, তখন অনেকের মনে এক অদ্ভুত দ্বৈত অনুভূতি কাজ করে—একদিকে শহুরে জীবনের বাস্তবতা, অন্যদিকে ফেলে আসা গ্রামের টান।
এদিকে, ঈদের তৃতীয় দিনেও পুরোপুরি থেমে নেই ঢাকাছাড়া মানুষের স্রোত। রাজধানীতে পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন শেষে অনেকেই এখন গ্রামের দিকে রওনা দিচ্ছেন। তাদের যুক্তি, ঈদের আগের চাপ এড়িয়ে একটু স্বস্তিতে ভ্রমণ করার জন্যই এই সময়টাকে বেছে নিয়েছেন। ফলে একদিকে যেমন ঢাকায় ফেরার চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে শহর ছাড়ার প্রবণতাও একেবারে কমেনি।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের ঈদযাত্রা তুলনামূলকভাবে সুশৃঙ্খল হয়েছে। যাত্রীদের চাপ থাকলেও তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ছিল জোরদার। ফলে দুর্ঘটনা বা বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার খবর তেমন শোনা যায়নি। এই ধারা বজায় থাকলে ভবিষ্যতে ঈদযাত্রা আরও স্বস্তিদায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজধানীতে ফিরে আসা মানুষদের জন্য এখন শুরু হচ্ছে পুরনো ছন্দে ফেরার পালা। অফিস, ব্যবসা, যানজট—সবকিছু আবার আগের মতোই সক্রিয় হয়ে উঠবে। তবে ঈদের স্মৃতি কিছুদিন অন্তত মনকে সতেজ রাখবে। অনেকেই বলছেন, এই স্বল্প সময়ের আনন্দই তাদের দীর্ঘ কর্মব্যস্ত জীবনে নতুন উদ্যম এনে দেয়।
ঢাকা শহরও যেন ধীরে ধীরে তার পরিচিত চেহারায় ফিরছে। ফাঁকা রাস্তাগুলো আবার ব্যস্ত হয়ে উঠছে। দোকানপাট খুলছে, যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে। শহরের গতি আবার দ্রুত হচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়েই কর্মজীবীরা ফিরছেন তাদের দায়িত্বে।
সব মিলিয়ে ঈদ-পরবর্তী এই যাত্রা শুধু স্থান পরিবর্তনের গল্প নয়। এটি এক ধরনের জীবনের চক্র। মানুষ ছুটে যায় আপনজনের কাছে, আবার ফিরে আসে জীবিকার টানে। এই যাওয়া-আসার মধ্যেই গড়ে ওঠে জীবনের ভারসাম্য। আর সেই চক্রেরই আরেকটি অধ্যায় আজ দেখা গেল ঢাকার ব্যস্ত নদীঘাটে।