প্রকাশ: ২৩ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশজুড়ে জ্বালানি খাতে এক অস্বস্তিকর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তেল সরবরাহের ঘাটতি ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে যেকোনো সময় সারাদেশের পেট্রোল পাম্প কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছে Bangladesh Petrol Pump Owners Association। রোববার রাতে দেওয়া এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটি দেশের জ্বালানি বিপণন ব্যবস্থার বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘চরম সংকটজনক’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কোম্পানিগুলো থেকে প্রতিদিন যে পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে, তা দিয়ে ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকদের ভিড় বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক সময় পর্যাপ্ত তেল পাচ্ছেন না তারা। এতে একদিকে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছেন, অন্যদিকে পাম্পে কর্মরত শ্রমিকদের ওপরও তৈরি হচ্ছে তীব্র শারীরিক ও মানসিক চাপ।
সংগঠনটির দাবি, এই পরিস্থিতি কেবল সরবরাহ সংকটের কারণে নয়, বরং জ্বালানি বিক্রির সময় কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় তা আরও জটিল হয়ে উঠছে। পাম্পগুলোতে বিশৃঙ্খলা প্রতিদিনই বাড়ছে বলে অভিযোগ তাদের। প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত না করায় অনেক ক্ষেত্রে পাম্প মালিক ও কর্মচারীরা নিজেদের ঝুঁকির মধ্যে রেখে কাজ করছেন।
তারা উদাহরণ দিয়ে জানায়, ঈদের আগের দিন একটি জেলা শহরের একটি পাম্পে ১০ হাজার ৫০০ লিটার পেট্রোল ও একই পরিমাণ অকটেন মজুত ছিল। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এই পরিমাণ জ্বালানি কয়েকদিন ধরে বিক্রি হওয়ার কথা। কিন্তু হঠাৎ করে অতিরিক্ত চাপ ও নিয়ন্ত্রণহীন ভিড়ের কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই সব শেষ হয়ে যায়। একই ধরনের পরিস্থিতি দেশের বিভিন্ন স্থানে দেখা গেছে বলে তারা উল্লেখ করেছে।
এই সংকটের পেছনে আরেকটি বড় কারণ হিসেবে তারা ‘অস্বাভাবিক কেনাকাটা’ ও ‘কালোবাজারি প্রবণতা’র কথা তুলে ধরেছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক মোটরসাইকেল চালক দিনে একাধিকবার পাম্পে এসে জ্বালানি নিচ্ছেন এবং পরে তা বেশি দামে বিক্রি করছেন। কেউ কেউ আংশিক ভর্তি ট্যাংক নিয়েই বারবার তেল নিচ্ছেন। ফলে প্রকৃত প্রয়োজন থাকা গ্রাহকরা বঞ্চিত হচ্ছেন, আর পাম্পে তৈরি হচ্ছে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি।
পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে যখন রাতের বেলায় সংঘবদ্ধভাবে পাম্পে হামলার ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ উঠে। সংগঠনটির ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু জায়গায় গভীর রাতে মব সৃষ্টি করে পাম্প খুলতে বাধ্য করা হয়েছে। এমনকি জোরপূর্বক তেল নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। ঠাকুরগাঁওয়ের একটি ঘটনার উল্লেখ করে তারা জানায়, সেখানে লাঠিসোঁটা নিয়ে এসে জ্বালানি সরবরাহ শেষ করে দেওয়া হয়। এই ধরনের ঘটনা পাম্প মালিকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে পাম্প মালিকরা বলছেন, নিরাপত্তা ছাড়া ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। শুধু পাম্পেই নয়, ডিপো থেকে তেল পরিবহনের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ট্যাংকারগুলো পথে লুট হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে বলে দাবি করা হয়েছে। ফলে জ্বালানি সরবরাহের পুরো শৃঙ্খলই এখন ঝুঁকির মুখে।
সংগঠনটি আরও জানায়, জরুরি সেবার জন্য জ্বালানি সংরক্ষণ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। ঈদের আগের রাতে অনেক পাম্পে অ্যাম্বুলেন্সের জন্য ন্যূনতম ২০০ লিটার অকটেনও সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। এমনকি সংরক্ষিত জ্বালানিও জোর করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে জরুরি চিকিৎসা সেবাও হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে তারা সতর্ক করেছে।
এই পরিস্থিতিতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। তাদের দাবি, পেট্রোল পাম্পগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানো এবং বিক্রয় প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। অন্যথায়, নিরাপত্তা ও সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে পাম্প মালিকরা তেল উত্তোলন বন্ধ করতে বাধ্য হবেন বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সংকট কেবল একটি খাতের সমস্যা নয়। এটি দেশের পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং দৈনন্দিন জীবনের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে তারা মনে করছেন।
সব মিলিয়ে দেশের জ্বালানি খাত এক সংকটময় সময় পার করছে। সাধারণ মানুষের ভোগান্তি যেমন বাড়ছে, তেমনি ব্যবসায়ীরাও পড়ছেন অনিশ্চয়তার মধ্যে। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত এবং কার্যকরভাবে এই সংকট মোকাবিলা করতে পারে।