অচল ডেমু ট্রেন মেরামতে নতুন সিদ্ধান্ত

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৩ মার্চ, ২০২৬
  • ০ বার

প্রকাশ: ২৩ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে থাকা ডেমু ট্রেনগুলো নিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে Bangladesh Railway। এক সময় যেগুলো ভাঙারি হিসেবে বিক্রির পরিকল্পনা করা হয়েছিল, এখন সেগুলোই মেরামত করে আবার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্ত ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন, বিশেষ করে যখন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন—বাস্তবে এসব ট্রেন সচল করা প্রায় অসম্ভব।

দেশের বিভিন্ন রেলইয়ার্ডে খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকা ডেমু ট্রেনগুলো এখন যেন ধীরে ধীরে স্ক্র্যাপে পরিণত হচ্ছে। ধুলা, বৃষ্টি আর সময়ের ক্ষয়ে তাদের অবস্থা এতটাই নাজুক হয়ে পড়েছে যে দূর থেকে দেখলে সেগুলো পরিত্যক্ত লোহার স্তূপ বলেই মনে হয়। অথচ প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা এই ট্রেনগুলো একসময় নগর ও শহরতলির স্বল্প দূরত্বের যাত্রী পরিবহনে বড় আশা জাগিয়েছিল।

২০১৪ সালে চীন থেকে ২০টি ডেমু ট্রেন কেনা হয়। উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত, সাশ্রয়ী এবং নিয়মিত যাত্রীসেবা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবতা খুব দ্রুতই ভিন্ন চিত্র দেখায়। চালুর এক বছরের মধ্যেই একে একে বিকল হতে শুরু করে ট্রেনগুলো। কয়েক বছরের ব্যবধানে পুরো বহরই অচল হয়ে পড়ে। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে কোনো কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় সেগুলো পড়ে থাকে অবহেলায়।

বর্তমানে ট্রেনগুলোর অবস্থা অত্যন্ত করুণ। বৈদ্যুতিক প্রযুক্তিনির্ভর এই ডেমুগুলোর অনেক যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে গেছে, কিছু অংশ খুলে পড়েছে। ইঞ্জিনসহ গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলো জং ধরে অকেজো হয়ে গেছে। এমনকি বিভিন্ন বৈদ্যুতিক ডিভাইসের বড় অংশ হারিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ফলে এগুলো মেরামতের কাজ কতটা বাস্তবসম্মত—তা নিয়েই সংশয় দেখা দিয়েছে।

রেলওয়ের মেকানিকরা বলছেন, দীর্ঘদিন খোলা জায়গায় পড়ে থাকার কারণে ট্রেনগুলোর অনেক অংশ মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। এমন অবস্থায় মেরামত করলেও তা টেকসই হবে না। তাদের মতে, এ ধরনের ট্রেন সচল রাখতে বিশেষায়িত ওয়ার্কশপ এবং প্রশিক্ষিত জনবল প্রয়োজন, যা দেশে নেই। ফলে মেরামত কার্যক্রম চালু করলেও তা দীর্ঘমেয়াদে ফলপ্রসূ হবে না।

ডেমু প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের আবহাওয়া এবং পরিবেশের সঙ্গে এই প্রযুক্তির সামঞ্জস্য ছিল না। উচ্চ তাপমাত্রা, ধুলাবালি এবং আর্দ্রতার কারণে দ্রুত যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে গেছে। তবুও এসব বিষয় বিবেচনা না করেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো যন্ত্রাংশের প্রাপ্যতা। দেশে এই ট্রেনগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ সহজলভ্য নয়। বিদেশ থেকে আনতে হলে সময় ও ব্যয়—দুই-ই বেড়ে যায়। ফলে মেরামতের খরচ অনেক বেশি হয়ে দাঁড়ায়, যা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয়।

প্রায় দুই বছর আগে এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ডেমু ট্রেনগুলো আর না চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় রেলওয়ে। এমনকি এগুলো ভাঙারি হিসেবে বিক্রির পরিকল্পনাও করা হয়েছিল। কিন্তু সেই পরিকল্পনা থেকে সরে এসে এখন আবার মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রেলওয়ের মহাপরিচালক Afzar Hossain জানিয়েছেন, ডেমু ট্রেনগুলোর বডি ফাইবার দিয়ে তৈরি হওয়ায় ভাঙারি হিসেবে বিক্রি করে তেমন অর্থ পাওয়া যাবে না। কিছু লোহার অংশ ছাড়া বড় কোনো আর্থিক লাভ নেই। তাই বিক্রি না করে মেরামতের মাধ্যমে পুনরায় চালুর চিন্তা করা হচ্ছে।

তবে এই যুক্তি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। রেল বিশেষজ্ঞ Dr. Hadiuzzaman প্রশ্ন তুলেছেন, এতদিন অবহেলায় পড়ে থাকা ট্রেনগুলো আদৌ চালানোর উপযোগী হবে কি না। তার মতে, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং অবকাঠামোগত ঘাটতি বিবেচনায় এটি একটি অকার্যকর উদ্যোগ হতে পারে। এমনকি এই সিদ্ধান্তের পেছনে অন্য কোনো স্বার্থ কাজ করছে কি না—সেই সন্দেহও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

রেলওয়ের নিজস্ব তথ্যও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। চালু থাকার সময়েও এই ডেমু ট্রেনগুলো থেকে পর্যাপ্ত আয় আসেনি। এমনকি জ্বালানি খরচ পর্যন্ত ওঠেনি বলে জানা গেছে। ফলে অর্থনৈতিক দিক থেকেও প্রকল্পটি শুরু থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ ছিল।

বিশ্লেষকরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে এমন প্রকল্পে আরও গভীর পরিকল্পনা ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। একটি ব্যর্থ প্রকল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা যদি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে তা আরও বড় আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

সব মিলিয়ে, ডেমু ট্রেন মেরামতের এই উদ্যোগ এখন এক ধরনের ‘পরীক্ষামূলক সিদ্ধান্ত’ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। এটি সফল হবে নাকি নতুন করে বিতর্ক তৈরি করবে—তা সময়ই বলে দেবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, এই ঘটনা দেশের অবকাঠামো পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হওয়ার প্রয়োজনীয়তাকে আবারও সামনে এনে দিয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত