রেমিট্যান্সে স্বস্তি: ২৩ দিনে ২.৮২ বিলিয়ন ডলার

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ, ২০২৬
  • ৫৭ বার

প্রকাশ: ২৪ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

 

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান অস্থিরতা, বিশেষ করে ইরানকে কেন্দ্র করে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি, বিশ্বজুড়ে অর্থনীতি ও প্রবাসী শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তার আবহ তৈরি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাগুলোর একটি ছিল রেমিট্যান্স প্রবাহ। কারণ মধ্যপ্রাচ্যই দেশের প্রবাসী আয়ের প্রধান উৎস, যেখানে লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি কর্মরত। যুদ্ধ বা রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়লে কর্মসংস্থান, আয়ের ধারাবাহিকতা এবং অর্থ পাঠানোর সক্ষমতা সবই হুমকির মুখে পড়ে। তবে আশঙ্কার বিপরীতে এক ধরনের স্বস্তির খবর এসেছে—চলতি মার্চ মাসের প্রথম ২৩ দিনেই প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ২৮২ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অঙ্কটি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ২০২৪ সালের একই সময় দেশে এসেছিল ২৬৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৭ দশমিক ৪০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বিশ্ব পরিস্থিতির অনিশ্চয়তার মধ্যেও এই বৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত বহন করছে। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। প্রথমত, আসন্ন ঈদকে কেন্দ্র করে প্রবাসীরা দেশে বেশি অর্থ পাঠিয়ে থাকেন, যাতে পরিবার-পরিজনের উৎসবের ব্যয় নির্বাহ করা যায়। ঈদ শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বাংলাদেশে একটি বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমেরও অংশ। তাই প্রবাসীরা বছরের এই সময়টাতে বাড়তি অর্থ পাঠাতে আগ্রহী হন। দ্বিতীয়ত, অনেক প্রবাসী মুসলিম ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে জাকাত ও দানের উদ্দেশ্যে অর্থ পাঠিয়ে থাকেন। এই মানবিক ও ধর্মীয় দায়বদ্ধতাও রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।

মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও, তারা তাদের পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালনে পিছপা হননি। বরং অনিশ্চয়তার মধ্যেও তারা চেষ্টা করেছেন নিয়মিত ও বৈধ চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থ পাঠাতে। এই বিষয়টি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

চলতি অর্থবছরের সামগ্রিক চিত্রও বেশ আশাব্যঞ্জক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে মার্চের ২৩ তারিখ পর্যন্ত দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ২ হাজার ৫৩৮ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল ২ হাজার ১১২ কোটি ডলার। অর্থাৎ বছরে প্রায় ১৯ দশমিক ৮০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থানকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির পেছনে নীতিগত পরিবর্তন এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপের বড় ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে অবৈধ পথে অর্থ পাঠানো বা হুন্ডি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর অবস্থান পরিস্থিতি বদলে দিয়েছে। আগে অনেক প্রবাসী দ্রুত ও সহজ উপায়ে অর্থ পাঠানোর জন্য হুন্ডি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতেন, যার ফলে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্সের পরিমাণ কমে যেত। বর্তমানে বিভিন্ন নজরদারি, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং সুবিধার উন্নয়নের কারণে প্রবাসীরা বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে বেশি উৎসাহিত হচ্ছেন।

 

এছাড়া ঋণের নামে অর্থ আত্মসাৎ এবং অর্থ পাচার রোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, তাও সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়লে বৈধ আর্থিক লেনদেন বৃদ্ধি পায়, যা শেষ পর্যন্ত রেমিট্যান্স প্রবাহেও প্রতিফলিত হয়।

রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাবও এখানে উল্লেখযোগ্য। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোতে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে, যার ফলে প্রবাসীদের আস্থাও কিছুটা বেড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আস্থার এই পরিবর্তন বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বাড়াতে সহায়ক হয়েছে।

গত অর্থবছর ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে রেমিট্যান্সের দিক থেকে একটি মাইলফলক। সে সময় দেশে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৩৩ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল। চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে এই রেকর্ড ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে বছরের বাকি সময় যদি প্রবাসী আয় একইভাবে বাড়তে থাকে, তাহলে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হতে পারে।

তবে সবকিছুর মাঝেও কিছু উদ্বেগ রয়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি যদি আরও জটিল হয়ে ওঠে, তাহলে সেখানে কর্মরত বাংলাদেশিদের চাকরি, আয় এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এতে ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হবে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শুধু প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভর না করে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও রপ্তানি খাতকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে প্রবাসীদের জন্য ব্যাংকিং সুবিধা আরও সহজলভ্য করা, লেনদেন খরচ কমানো এবং নিরাপদ চ্যানেল নিশ্চিত করা জরুরি। এতে দীর্ঘমেয়াদে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও স্থিতিশীল ও টেকসই হবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে। এটি শুধু সংখ্যার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং প্রবাসীদের দেশপ্রেম, দায়িত্ববোধ এবং পরিবারের প্রতি ভালোবাসারও প্রতিফলন। এই ধারা বজায় রাখতে পারলে দেশের অর্থনীতি আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারবে।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত