প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশে কৃষিক্ষেত্রে সম্ভাব্য সঙ্কটের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেল এবং সার সরবরাহে বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব পড়ে দেশের কৃষক ও কৃষি অর্থনীতির ওপর। বাংলাদেশে বোরো ও আসন্ন আমন মৌসুমের জন্য সার এবং জ্বালানি সরবরাহের ওপর সরাসরি নির্ভরশীলতা থাকায় মধ্যপ্রাচ্যে সংঘটিত সংকটের প্রভাব স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত দেখা দিতে পারে।
বাংলাদেশের সার চাহিদার একটি বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব ও কাতার থেকে। পাশাপাশি, দেশীয় সার কারখানাগুলোতে যে উৎপাদন হয়, তারও বড় ভরসা আমদানিকৃত গ্যাসের ওপর। কিন্তু উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান যুদ্ধ এবং নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে এই সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ফলে কৃষকরা বোরো মৌসুমে সেচের জন্য জ্বালানি তেল পেতে সমস্যায় পড়েছেন এবং তারা আশঙ্কা করছেন, আমন মৌসুমে সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ পাওয়া যাবে কিনা।
তবে সরকার এ শঙ্কা নস্যাৎ করে বলেছে যে, সার নিয়ে কোনো সংকটের কারণ নেই। কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন, বর্তমান মজুদ দেশের এক বছরের চাহিদা পূরণে পর্যাপ্ত। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি ও সার সংগ্রহের কাজও শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, “আমদানির প্রধান উৎস মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আমরা চীন, মিশর ও অন্যান্য দেশ থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি। এই প্রক্রিয়ায় বিকল্প বাজারের সাথে যোগাযোগ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে।”
যদিও সরকার আশ্বাস দিচ্ছে, দেশের বিভিন্ন জেলায় মাঠ পর্যায়ে ভিন্ন পরিস্থিতির খবর পাওয়া গেছে। কিছু এলাকায় ডিলাররা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সারের দাম বৃদ্ধি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম বলেন, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি ও সারের সংকট তৈরি হতে পারে, তবে বাংলাদেশের প্রকৃত সমস্যার মূল হলো কৃত্রিম সংকট তৈরি করা। তিনি বলেন, “সারের প্রাপ্যতা থাকা সত্ত্বেও কখনো কখনো স্থানীয় পর্যায়ে স্বল্প সরবরাহ দেখানো হয়, যা দামের ওপর প্রভাব ফেলে।”
উৎপাদনের দিক থেকেও প্রভাব পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সংকট এবং নিরাপত্তাজনিত কারণে দেশের সার উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি প্রধান সার কারখানার মধ্যে চারটি মার্চ মাসের শুরু থেকে বন্ধ রাখা হয়েছে। বেসরকারি কাফকো কারখানাও উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। তবে কৃষিমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন, এই কারখানাগুলো শিগগিরই পুনরায় চালু হবে। তিনি বলেন, “জ্বালানি রেশনিংয়ের অংশ হিসেবে সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখা হলেও, মজুদ পর্যাপ্ত থাকায় কৃষকের চাহিদা পূরণ সম্ভব।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে শুধুমাত্র মজুদ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে চাহিদা পূরণ করা কঠিন হবে। তাই বিকল্প উৎস থেকে দ্রুত সার আমদানির ব্যবস্থা এবং বন্ধ থাকা কারখানাগুলো পুনরায় চালু করা প্রয়োজন। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ডিন ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম বলেন, “এই সময় বোরো মৌসুম শেষের দিকে, তাই আপাতত তেমন সমস্যা হবে না। তবে বিকল্প উৎস থেকে আমদানির উদ্যোগে দেরি করা উচিত নয়। এতে দাম কিছুটা বাড়তেও পারে।”
জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ফসল উৎপাদন এককভাবে চলতে পারে না; এর জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কমানো এবং সার উৎপাদন ও সরবরাহে বিকল্প উৎসের বিকল্প ব্যবস্থা জরুরি।
বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতি ও ফসলি উৎপাদন ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সরকার এবং কৃষি বিশেষজ্ঞরা একযোগে কাজ করছেন। কৃষকরা আশা করছেন, দেশের মজুদ পর্যাপ্ত এবং বিকল্প আমদানি ব্যবস্থা কার্যকর থাকলে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে সতর্কতা অবলম্বন করা এবং কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।