প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কক্সবাজার, বাংলাদেশ – জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও পবিত্র রমজানকে ঘিরে দীর্ঘদিনের স্থবিরতার পর আবারও চাঙা হয়ে উঠেছে সমুদ্রসৈকতের নগরী কক্সবাজার। ঈদের টানা ছুটি এবং স্বাধীনতা দিবসের সংযুক্তি একসঙ্গে মানুষকে দীর্ঘ অবকাশ কাটানোর সুযোগ দিয়েছে, আর সেই সুযোগে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকদের ভিড় লক্ষ করা গেছে। স্থানীয় পর্যটন সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ২১ থেকে ২৭ মার্চ পর্যন্ত মাত্র এক সপ্তাহে কক্সবাজারে ভ্রমণ করেছে ছয় লাখের বেশি পর্যটক। এই এক সপ্তাহে পর্যটন খাতে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার ব্যবসা হয়েছে, যা কক্সবাজারের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে নতুন করে আশা সঞ্চার করেছে।
ঈদের আগে ও পরে লাবণী, সুগন্ধা, কলাতলী পয়েন্টসহ পুরো সৈকতজুড়ে পর্যটকের ভিড় চোখে পড়ার মতো ছিল। সমুদ্রসৈকতের প্রতিটি জায়গা যেন পর্যটকের পদধ্বনি ও আনন্দধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠেছিল। ছোট ছোট শিশুরা বালিতে খেলছিল, তরুণরা সমুদ্রে স্নান উপভোগ করছিল, আর বয়স্ক পর্যটকরা সৈকতের বেলাভূমিতে বসে সূর্যাস্তের মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের সৌন্দর্য উপভোগ করছিলেন।
পর্যটকের চাপের কারণে সৈকতের ফটোগ্রাফার, বিচ বাইক ও জেট স্কি চালক, ঘোড়াওয়ালা এবং কিটকট ব্যবসায়ীরা ব্যস্ত সময় পার করেছেন। শুটকি, আচার, পার্ল হাউস ও বার্মিজ মার্কেটও ব্যাপক ব্যবসার মুখোমুখি হয়েছে। এসব ব্যবসায়ীদের মধ্যে সন্তোষ প্রকাশ পাওয়া গেছে। বিচ বাইক চালক মোহাম্মদ রাসেল জানান, “রমজানের এক মাসের স্থবিরতা কাটিয়ে ব্যবসা আবার আগের রূপে ফিরে এসেছে। এখন ব্যবসা ভালোই চলছে এবং পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক।”
জেট স্কি চালক সাদ্দাম হোসেন বলেন, “রমজানে পর্যটক না থাকায় আমরা প্রায় বসে ছিলাম। এখন পর্যটক আসতে শুরু করায় খুব ভালো লাগছে। ব্যবসাও ভালো চলছে, খারাপ যাচ্ছে না, যা আমাদের অনেক খুশি করেছে।” ঘোড়াওয়ালা মোহাম্মদ রফিকও তার সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং বলেন, “ঈদের পর থেকে আয়-রোজগার বেশ ভালো হচ্ছে। রোজার সময় যেখানে আয় ছিল না, এখন পরিস্থিতি অনেক উন্নত। আশা করি সামনে আরও ভালো আয় হবে এবং বেশি পর্যটক আসবে।”
ফটোগ্রাফার মামুন জানান, ঈদের ছুটিতে পর্যটকের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। আগে যেখানে আয় কম ছিল, এখন সারাদিনে ২ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত পর্যটকদের ছবি তুলে আয় হচ্ছে। ফলে আগের তুলনায় ব্যবসা অনেক ভালো হয়েছে। লাবণী শুঁটকি বিতানের স্বত্বাধিকারী শামশেদ আলম বলেন, “ঈদের আগে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার শুঁটকি সংগ্রহ করেছি এবং এখন ভালোই বিক্রি হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ৭০-৮০ হাজার থেকে প্রায় ১ লাখ টাকার বিক্রি হচ্ছে, যা আমাদের জন্য বেশ সন্তোষজনক।”
মোরশেদ আচার বিতানের স্বত্বাধিকারী মোরশেদ আলমও সন্তুষ্ট। তিনি জানান, “রমজানের আগে দোকানে প্রায় ৫ লাখ টাকার মালামাল ছিল। ঈদের জন্য আরও ৭ লাখ টাকার পণ্য সংগ্রহের ফলে মোট ১২ লাখ টাকার মালামাল পর্যটকদের জন্য সাজানো হয়েছিল। আলহামদুলিল্লাহ, ব্যবসা ভালো হচ্ছে; দৈনিক গড়ে ৫০-৬০ হাজার টাকার বিক্রি হচ্ছে এবং এই ধারা এখনও অব্যাহত রয়েছে।”
ঈদ, স্বাধীনতা দিবস এবং সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে সমুদ্রপাড়ের পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের কক্ষ ছিল শতভাগ বুকিং। রেস্তোরাঁগুলোতেও পর্যটকের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো ছিল। হোটেল কক্স-টুডের রিজারভেশন ম্যানেজার তাসবিয়া চৌধুরী জিনি জানান, “ঈদ উপলক্ষে টানা প্রায় ১০ দিনের ছুটি ছিল। পুরোপুরি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব না হলেও সামগ্রিকভাবে অতিথিদের কাছ থেকে ভালো সাড়া পাওয়া গেছে। ছুটি ঈদের কিছুটা আগেই শুরু হওয়ায় প্রত্যাশা কিছুটা কম পূরণ হয়েছে, তবুও প্রাপ্ত সাড়া সন্তোষজনক এবং অতিথিরা সেবায় সন্তুষ্ট।”
প্রাসাদ প্যারাডাইস হোটেলের ব্যবস্থাপক মো. ইয়াকুব আলী জানান, ঈদের পরবর্তী সময়েও পর্যটন ব্যস্ততা প্রত্যাশা অনুযায়ী ছিল। টানা প্রায় পাঁচ দিন হোটেলের কক্ষগুলো শতভাগ বুকিং ছিল। এই ধারা আগামী পহেলা বৈশাখ পর্যন্ত অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির তথ্যমতে, ঈদ, স্বাধীনতা দিবস ও সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে গত ৭ দিনে ৬ লাখের বেশি পর্যটক কক্সবাজারে ভ্রমণ করেছেন। এতে পর্যটন সংশ্লিষ্ট সব খাতে ৬০০ কোটিরও বেশি টাকার ব্যবসা হয়েছে। চেম্বারের মুখপাত্র আবিদ আহ্সান সাগর বলেন, “প্রত্যাশিত পর্যটকের আগমন এবার হয়েছে এবং ব্যবসায় একটি স্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করছে। আগের সময়ের তুলনায় বর্তমানে পর্যটন খাত অনেক বেশি স্থিতিশীল।”
তিনি আরও বলেন, “সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে ভবিষ্যতে পর্যটন খাতে ১০০০ থেকে ১২০০ কোটি টাকার ব্যবসার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। কক্সবাজারে সময়োপযোগী বিনোদনের ব্যবস্থাও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে, যাতে পর্যটকদের আকর্ষণ আরও বৃদ্ধি পায় এবং পর্যটন শিল্প দীর্ঘমেয়াদে টেকসইভাবে এগিয়ে যেতে পারে।”
এদিকে, সি-সেইফ লাইফ গার্ড সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ দিনে সমুদ্রস্নানে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ মানুষকে লাইফগার্ড সেবার আওতায় আনা হয়েছে। পাশাপাশি সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে ৮০ হাজারের বেশি পর্যটককে সচেতন করা হয়েছে।