প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত বুশেহর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছে শুক্রবার রাতে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানা হয়েছে। দেশটির আণবিক শক্তি সংস্থা জানিয়েছে, এটি একই স্থাপনার লক্ষ্যবস্তু করে তৃতীয়বারের মতো হামলা, যা ইরানকে গভীর উদ্বেগে ফেলেছে। এ হামলায় কেউ হতাহত হয়নি এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের কোনো ক্ষতি হয়নি। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং ইরানের পক্ষ থেকে এটি গুরুতর হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইরানের আণবিক শক্তি সংস্থার বরাতে জানা গেছে, শুক্রবার রাতের হামলায় শুধু বুশেহর কেন্দ্রই লক্ষ্যবস্তু ছিল না; দেশটির অন্যান্য পরমাণু স্থাপনায়, যেমন ইউরেনিয়াম উৎপাদনকেন্দ্র এবং ভারী পানির চুল্লি, ইসরায়েলি বাহিনী হামলা চালিয়েছে। এ ছাড়াও ইসফাহানে দুটি ইস্পাত কারখানাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। এই ঘটনাগুলো ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম আইআরআইবি এবং তাসনিমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সতর্ক করে বলেছেন, এসব হামলা আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তি লঙ্ঘন। শান্তিপূর্ণ পরমাণু স্থাপনা সামরিক হামলা থেকে সুরক্ষিত থাকা উচিত। তিনি আরও জানিয়েছেন, এসব হামলা শুধুমাত্র একটি দেশের জন্য নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য বিপজ্জনক। আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট করে বলেছেন, ইসরায়েলকে এই অপরাধের জন্য ‘চড়া মূল্য’ দিতে হবে। তিনি আরও স্পষ্ট করেছেন, ইসরায়েল দাবি করছে হামলা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে করা হয়েছে, কিন্তু এটি ইরানের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
এ হামলা এমন সময়ে এসেছে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার শর্তে ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা কিছুটা বিলম্ব করার কথা উল্লেখ করেছিলেন। হরমুজ প্রণালী মধ্যপ্রাচ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হিসেবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের সঙ্গে সংযুক্ত। ইরান ইতিমধ্যে পারস্য উপসাগরের মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছে এবং ‘বন্ধুপ্রতীম’ কিছু দেশের জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিয়েছে। তবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোতে হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি জারি করেছে।
ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিন ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে হামলা চালানোর পর, তেহরান এ হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক অবস্থান আরও জোরদার করেছে। হিউম্যান রাইটস ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এসব হামলা আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার জন্য বিরাট হুমকি তৈরি করছে। তেহরান জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) সতর্ক করে জানিয়েছে, ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি মালিকানাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও কর্মীদের দ্রুত কর্মস্থল ত্যাগ করতে হবে। এটি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও সম্ভাব্য হামলা এড়িয়ে চলার জন্য জরুরি পদক্ষেপ।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরান ও ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত একদিকে জ্বালানি সরবরাহে বৈশ্বিক প্রভাব ফেলছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করছে। বুশেহর কেন্দ্রসহ পরমাণু স্থাপনাগুলো সুরক্ষিত থাকলেও বারবার হামলা প্রমাণ করছে যে এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের কড়া হুঁশিয়ারি এবং প্রতিক্রিয়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করেছে। বিশেষত, শান্তিপূর্ণ পরমাণু শক্তি ব্যবহারে হামলা কোনোভাবেই বৈধ নয়। এটি শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্বের নিরাপত্তার জন্যও সংকেত বহন করছে। আন্তর্জাতিক আইন এবং নানামাত্রিক চুক্তি অনুযায়ী, যেকোনো দেশের পরমাণু স্থাপনা সামরিক হামলা থেকে সুরক্ষিত থাকার অধিকার রাখে।
এই পরিস্থিতি যখন ক্রমশ উত্তপ্ত হচ্ছে, তখন ইরান জোরালো কূটনৈতিক পদক্ষেপ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে নিজেদের স্থাপনা ও নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে তেহরান ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে বারবার সতর্ক করছে যে, পরমাণু স্থাপনায় হামলা করলে চড়া মূল্য দিতে হবে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, পরমাণু স্থাপনায় হামলা এবং তার পরবর্তী উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের আন্তর্জাতিক বাজারেও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কূটনৈতিক এবং সামরিক পদক্ষেপ আরও সূক্ষ্ম ও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।