ইরান যুদ্ধে তেলের দাম বাড়ায় রাশিয়ার স্বস্তি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৮ মার্চ, ২০২৬
  • ১৪ বার
ইরান যুদ্ধে তেলের দাম বাড়ায় রাশিয়ার স্বস্তি

প্রকাশ: ২৮ মার্চ  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যের তেলের উত্তপ্ত পরিস্থিতি রাশিয়ার জন্য এক অপ্রত্যাশিত আর্থিক স্বস্তি হিসেবে কাজ করছে। ইরান যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ক্রেমলিনের আয় বেড়ে যাচ্ছে, যা তাদের ফেডারেল বাজেটের ঘাটতি কমাতে সহায়তা করছে এবং ইউক্রেনের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের জন্য অর্থের নতুন সংস্থান তৈরি করছে। শুধু তেল নয়, প্রাকৃতিক গ্যাস, সার, হিলিয়াম ও অ্যালুমিনিয়ামের বৈশ্বিক সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারণে রাশিয়ার অর্থনৈতিক লাভ আরও বাড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) জ্যেষ্ঠ সহযোগী বেন কাহিল উল্লেখ করেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী রাশিয়া। তিনি বলেন, ‘‘এতদিন রাশিয়া ছাড় দিয়ে তেল বিক্রি করত, কিন্তু যুদ্ধের কারণে তারা এখন বাজারমূল্যে তেল বিক্রি করছে। এটি রাশিয়ার অর্থনীতির জন্য একটি বড় ইতিবাচক ঘটনা।’’ বাস্তবতা হলো, যুদ্ধের আগে রাশিয়ার বাজেট সংকটের মুখে পড়ার আশঙ্কা ছিল, এবং মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত অন্তত স্বল্প সময়ের জন্য তাদের স্বস্তি এনে দিয়েছে।

রাশিয়ার অর্থমন্ত্রণালয় ইঙ্গিত দিয়েছে, যে ব্যয়সংকোচনের পরিকল্পনা চলতি বছরের জন্য ছিল, তা ২০২৭ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হতে পারে। মার্চের মাঝামাঝি সময়ে রাশিয়ার উরাল তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারে পৌঁছেছে, যা ফেব্রুয়ারির তুলনায় দ্বিগুণ। এই বৃদ্ধি থেকে মার্চে প্রায় ৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন বা ৮৫০ কোটি ডলার অতিরিক্ত আয় হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার সরাসরি রাষ্ট্রের কোষাগারে যাচ্ছে।

রাশিয়ার বাজেটের প্রায় এক-চতুর্থাংশ অর্থ আসে তেল ও গ্যাস বিক্রির আয় থেকে। ইউক্রেনের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে এই অর্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, যা ইউক্রেনের জন্য অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। ইরান যুদ্ধের আগে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার তেলের ক্রেতা কমে যাচ্ছিল। ভারতসহ বড় ক্রেতারাও কম দামে তেল কিনতে চাপ দিচ্ছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে রাশিয়ার তেলের অবস্থা দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছে।

উপাত্ত বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলার জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা বাড়িয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে যে পরিমাণ তেল কিনেছিল, মার্চে তা প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে। এমনকি ভারতের ক্রয় মূল্য ব্রেন্ট ক্রুডের চেয়ে বেশি হয়েছে।

রাশিয়ার তেল অবকাঠামো ইউক্রেনের হামলার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে ক্ষতির প্রভাব সামলাতে সক্ষম হচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ড্রোন হামলা, পাইপলাইন সংকট ও ট্যাংকার জব্দের কারণে রাশিয়ার তেল রপ্তানির অন্তত ৪০ শতাংশ সক্ষমতা ব্যাহত হয়েছে।

ইরান যুদ্ধের প্রভাব শুধু তেলেই সীমাবদ্ধ নয়। হরমুজ প্রণালি অস্থিতিশীল হওয়ায় প্রাকৃতিক গ্যাস, সার ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহ ঝুঁকিতে। রাশিয়া, যা এই পণ্যের বড় উৎপাদক, ইতোমধ্যেই বেশি কার্যাদেশ পাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদে নির্ভরশীল হতে পারে।

প্রাকৃতিক গ্যাস ক্ষেত্রে রাশিয়ার কৌশলও ইতিবাচক। ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার গ্যাস থেকে পুরোপুরি সরে আসার পরিকল্পনা পিছিয়ে দিতে পারে। ভারতের চীনের সঙ্গে কৌশলগত পরিবর্তনও রাশিয়ার জন্য সুবিধাজনক হতে পারে। ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-২’ নামক প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পের মাধ্যমে রাশিয়া পূর্ব সাইবেরিয়া থেকে চীন পর্যন্ত সরাসরি গ্যাস সরবরাহের সুযোগ তৈরি করেছে।

তবে দীর্ঘমেয়াদে রাশিয়ার জন্য লাভ সবসময় স্থায়ী নাও হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় চীন ও ভারত নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও কয়লার ব্যবহার বাড়াতে আগ্রহী হতে পারে। এই দুই অর্থনীতি জ্বালানি আমদানি–নির্ভরতা কমাতে পদক্ষেপ নিলে রাশিয়ার বাজারে চাপ পড়তে পারে।

বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি স্বল্পমেয়াদে রাশিয়ার জন্য স্বস্তি নিয়ে এসেছে, কিন্তু সরকারি ঋণ বৃদ্ধির কারণে ভবিষ্যতে বিনিয়োগের ওপর চাপ বাড়বে। অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার জন্য এটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে কাজ করবে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিশ্লেষকরা আশা করছেন, রাশিয়ার ২০২৬ সালের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে মাত্র ০.৬ শতাংশ, যেখানে ২০২৫ সালে তা ছিল ১ শতাংশ।

সংক্ষেপে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত রাশিয়ার জন্য স্বল্পমেয়াদে আর্থিক সুবিধা নিয়ে এসেছে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি যে কতটা স্থায়ী হবে, তা যুদ্ধের স্থায়িত্ব, বিশ্ববাজারের চাহিদা এবং অন্যান্য শক্তিশালী অর্থনীতির কৌশলের ওপর নির্ভর করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত