প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঈদুল ফিতরের আনন্দঘন ছুটি শেষ হতেই আবার কর্মব্যস্ত জীবনে ফিরছে মানুষ। দেশের উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার মানুষ ঢাকার পথে যাত্রা শুরু করায় মহাসড়ক ও সেতুগুলোতে চাপ বেড়েছে দৃশ্যমানভাবে। এই বাস্তবতায় দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো যমুনা সেতু হয়ে উঠেছে ব্যস্ততম চলাচলের কেন্দ্র। গত ২৪ ঘণ্টায় এই সেতু দিয়ে বিপুলসংখ্যক যানবাহন পারাপারের ফলে টোল আদায়ে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শুক্রবার রাত ১২টা থেকে শনিবার রাত ১২টা পর্যন্ত মাত্র একদিনে মোট ৪২ হাজার ৩৭৪টি যানবাহন সেতুটি অতিক্রম করেছে। এতে মোট টোল আদায় হয়েছে ৩ কোটি ৩১ লাখ ১৫ হাজার ৫০ টাকা, যা ঈদ-পরবর্তী সময়ে যান চলাচলের চাপের একটি স্পষ্ট প্রতিফলন। মানুষের কর্মস্থলে ফেরার তাড়না এবং সময় বাঁচানোর প্রবণতা এই সংখ্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যানবাহনের দিকভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উত্তরবঙ্গমুখী গাড়ির সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও ঢাকামুখী যানবাহনের চাপ ছিল অনেক বেশি। উত্তরবঙ্গগামী ১৮ হাজার ৩৬টি যানবাহন পারাপারের মাধ্যমে টোল আদায় হয়েছে ১ কোটি ৬০ লাখ ২৪ হাজার ৪৫০ টাকা। অন্যদিকে ঢাকামুখী ২৪ হাজার ৩৩৮টি যানবাহন পারাপারে টোল আদায় হয়েছে ১ কোটি ৭০ লাখ ৯০ হাজার ৬০০ টাকা। এই ব্যবধান স্পষ্ট করে দেয় যে, ঈদের ছুটি শেষে রাজধানীতে ফেরার ঢলই মূলত সেতুটিকে অতিরিক্ত ব্যস্ত করে তুলেছে।
যমুনা সেতু সাইট অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ রিয়াজ উদ্দিন জানান, গত কয়েকদিন ধরেই ঢাকামুখী মানুষের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে সেতুর উভয় পাশে মোট ১৮টি টোল বুথ চালু রাখা হয়, যাতে যানবাহন দ্রুত পারাপার হতে পারে। তবে এত কিছুর পরও কোথাও কোথাও ধীরগতির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে ব্যস্ত সময়গুলোতে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, অতিরিক্ত যানবাহনের চাপের কারণে সেতুর ওপর একাধিক ছোটখাটো দুর্ঘটনাও ঘটেছে। যদিও এসব দুর্ঘটনা বড় ধরনের বিপর্যয়ে রূপ নেয়নি, তবুও তা সাময়িকভাবে যান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে। ফলে সেতু পার হতে অনেক চালক ও যাত্রীকে কিছুটা ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ঈদকে কেন্দ্র করে প্রতিবছরই এই চিত্র দেখা যায়, তবে এবার যানবাহনের সংখ্যা এবং টোল আদায়ের পরিমাণ আগের তুলনায় আরও বেশি হতে পারে। এর পেছনে দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম বৃদ্ধি, ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বাড়া এবং সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই সেতুটি ১৯৯৮ সালে চালু হওয়ার পর থেকেই দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ সহজ করেছে। সেই সময় থেকে নিয়মিতভাবে টোল আদায়ের মাধ্যমে সেতুর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা ব্যয় মেটানো হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে কমিউটার সিস্টেম নেটওয়ার্ক (সিএনএস) টোল ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করলেও, সাম্প্রতিক সময়ে এই দায়িত্ব নিয়েছে China Road and Bridge Corporation।
বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে টোল আদায় কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ ও দ্রুত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে যানবাহন পারাপারের সময় কমানো এবং যানজট হ্রাস করার চেষ্টা চলছে। তবে ঈদের মতো বিশেষ সময়ে হঠাৎ করে যানবাহনের চাপ বেড়ে যাওয়ায় এই ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়, যা পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব হয় না।
সাধারণ যাত্রীদের অভিজ্ঞতায়ও একই চিত্র উঠে এসেছে। অনেকেই জানিয়েছেন, দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি এবং সেতুর ওপর ধীরগতির কারণে কিছুটা ভোগান্তি হলেও, আগের তুলনায় পরিস্থিতি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রিত ছিল। বিশেষ করে টোল বুথের সংখ্যা বাড়ানো এবং কর্তৃপক্ষের তৎপরতা যানজট কমাতে সহায়তা করেছে।
সড়ক পরিবহন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভবিষ্যতে এই ধরনের চাপ মোকাবিলায় আরও উন্নত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিকল্প রুট তৈরি এবং স্মার্ট টোল সিস্টেম চালু করা জরুরি। কারণ দেশের অর্থনীতি যত এগোবে, ততই সড়কপথে যানবাহনের চাপ বাড়বে—এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
সব মিলিয়ে ঈদ-পরবর্তী সময়ে যমুনা সেতু-কেন্দ্রিক এই ব্যস্ততা শুধু একটি সাময়িক পরিস্থিতি নয়, বরং দেশের চলমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক গতিশীলতারই প্রতিফলন। টোল আদায়ের পরিমাণ এবং যানবাহনের সংখ্যা—দুটিই প্রমাণ করে, দেশের মানুষের চলাচল ও কর্মব্যস্ততা আগের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে।