প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বের বড় শহরগুলোর মধ্যে বায়ুদূষণ একটি ক্রমবর্ধমান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেগাসিটি ঢাকা এই তালিকা থেকে বাদ নেই, বরং প্রায় নিয়মিতভাবেই দূষণের উচ্চমাত্রা নিয়ে আলোচনায় থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু বৃষ্টিপাত হলেও বায়ুর মানে তেমন উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। রোববার সকালে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার বায়ুমান এখনো ‘অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ে অবস্থান করছে, যা নগরবাসীর জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণ সংস্থা IQAir-এর তথ্যানুযায়ী, রোববার সকালে Dhaka, Bangladesh শহরের এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI) স্কোর ছিল ১৮৭। এই সূচক অনুযায়ী ঢাকাকে বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে রাখা হয়েছে। AQI স্কোর ১৫১ থেকে ২০০-এর মধ্যে থাকলে সেটিকে ‘অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা দীর্ঘ সময় ধরে শ্বাস নেওয়ার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ নির্দেশ করে।
ঢাকার এই অবস্থান এমন এক সময়ে এসেছে যখন বিশ্বের অন্যান্য বড় শহরগুলোর বায়ুমান আরও খারাপ অবস্থায় রয়েছে। তালিকার শীর্ষে রয়েছে Chiang Mai, Thailand, যার AQI স্কোর ২২০। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা Delhi, India শহরের স্কোর ২০৭। এরপর ঢাকার ঠিক পরেই চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে Beijing, China, যার স্কোর ১৬৯। পঞ্চম স্থানে থাকা Yangon, Myanmar শহরের AQI স্কোর ১৬৭।
বায়ুমানের এই সূচক শুধু একটি সংখ্যার হিসাব নয়, বরং এটি সরাসরি মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে বায়ুদূষণ দীর্ঘদিন ধরে একটি নীরব সংকটে পরিণত হয়েছে। যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলা, শিল্পকারখানার নির্গমন এবং আবর্জনা পোড়ানো—এসব মিলিয়ে শহরের বায়ু ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছে।
সাম্প্রতিক সময়ে মাঝে মাঝে বৃষ্টিপাত হলেও তা দূষণ কমাতে তেমন কার্যকর হয়নি। সাধারণত বৃষ্টি হলে বায়ুমণ্ডলে ভাসমান ধুলিকণা নিচে নেমে আসে এবং সাময়িকভাবে বায়ুমান উন্নত হয়। তবে স্থায়ী উৎসগুলো নিয়ন্ত্রণ না হলে এই উন্নতি টেকসই হয় না। ফলে বৃষ্টির পরও ঢাকার বায়ু আবার দ্রুত দূষিত হয়ে পড়ে।
AQI সূচকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ০ থেকে ৫০ ভালো বায়ুমান নির্দেশ করে, যা স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেওয়ার জন্য উপযোগী। ৫১ থেকে ১০০ মাঝারি হিসেবে বিবেচিত হয়, যেখানে সংবেদনশীল ব্যক্তিদের জন্য কিছুটা সতর্কতা প্রয়োজন হয়। ১০১ থেকে ১৫০ স্কোর সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর ধরা হয়। ১৫১ থেকে ২০০ হলে তা সাধারণ মানুষের জন্যও অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে পড়ে, এবং ২০১ থেকে ৩০০ হলে সেটি ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে চিহ্নিত হয়। ৩০১-এর উপরে গেলে তা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ অবস্থায় পৌঁছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করে।
ঢাকার বর্তমান স্কোর ১৮৭ হওয়ায় শহরের শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্তদের জন্য পরিস্থিতি বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। চিকিৎসকরা বলছেন, এই ধরনের বায়ুমান দীর্ঘ সময় ধরে থাকলে হাঁপানি, ফুসফুসের সমস্যা, হৃদরোগ এবং অন্যান্য শ্বাসযন্ত্রের রোগের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে যারা নিয়মিত বাইরে কাজ করেন, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকার বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। শুধু সাময়িক উদ্যোগ নয়, বরং যানবাহনের নির্গমন নিয়ন্ত্রণ, নির্মাণকাজে ধুলা ব্যবস্থাপনা, শিল্পকারখানার নির্গমন মানদণ্ড কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং সবুজ এলাকা বৃদ্ধি করা জরুরি। পাশাপাশি গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নও বায়ুদূষণ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে, সাধারণ নাগরিকদের সচেতনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অপ্রয়োজনে বাইরে কম যাওয়া, মাস্ক ব্যবহার করা, এবং ব্যক্তিগত পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা—এগুলো বায়ুদূষণের প্রভাব কিছুটা হলেও কমাতে সহায়তা করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বায়ুদূষণ একটি যৌথ সমস্যা, যার সমাধানও যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমেই সম্ভব।
বিশ্বব্যাপী নগরায়ণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বায়ুদূষণ এখন একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর বড় শহরগুলোতে এই সমস্যা আরও প্রকট। ঢাকার বর্তমান পরিস্থিতি সেই বৈশ্বিক বাস্তবতারই একটি প্রতিফলন, যেখানে অর্থনৈতিক কার্যক্রম ও পরিবেশগত ভারসাম্যের মধ্যে একটি টানাপোড়েন স্পষ্ট।
সব মিলিয়ে, Dhaka, Bangladesh-এর বায়ুমান আজও ‘অস্বাস্থ্যকর’ অবস্থায় রয়েছে, যা নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজন দ্রুত ও কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং নাগরিক সচেতনতা। না হলে বায়ুদূষণ শুধু একটি পরিসংখ্যান হয়ে থাকবে না, বরং এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রূপ নেবে।