মধ্যপ্রাচ্য সংকটে ফ্লাইট বাতিল, বাড়ছে ভোগান্তি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২৬
  • ৩ বার
মধ্যপ্রাচ্য সংকটে ফ্লাইট বাতিল, বাড়ছে ভোগান্তি

প্রকাশ: ৩০ মার্চ  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত পরিস্থিতির প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে। নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় সাতটি দেশ তাদের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করায় বিশ্বের বিভিন্ন রুটে ফ্লাইট চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের প্রধান আন্তর্জাতিক গেটওয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-এ। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত মোট ৮৫৮টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। শুধু আজ সোমবারও বাতিল হয়েছে ১৮টি ফ্লাইট, যা যাত্রীদের ভোগান্তিকে আরও দীর্ঘায়িত করেছে।

বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সগুলো নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের নির্ধারিত রুট পরিবর্তন বা সাময়িকভাবে ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রবাসী কর্মী, ব্যবসায়ী ও চিকিৎসা কিংবা শিক্ষার উদ্দেশ্যে ভ্রমণরত যাত্রীরা। অনেকে ইতোমধ্যে একাধিকবার টিকিট পরিবর্তন বা ভ্রমণ পরিকল্পনা স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছেন।

আজ বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোর মধ্যে রয়েছে কুয়েতগামী দুটি, শারজাহগামী চারটি, বাহরাইনগামী দুটি, কাতারগামী চারটি, দুবাইগামী দুটি এবং কুয়েতগামী আরও চারটি ফ্লাইট। এসব ফ্লাইট পরিচালনা করে থাকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত কয়েকটি এয়ারলাইন্স, যার মধ্যে রয়েছে Qatar Airways, Emirates, Air Arabia, Gulf Air এবং Jazeera Airways। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন প্রধান অগ্রাধিকার হওয়ায় সাময়িক অসুবিধা হলেও ফ্লাইট বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ বা বেবিচক জানিয়েছে, গত এক মাসের বেশি সময় ধরে প্রতিদিনই বিভিন্ন সংখ্যক ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২৩টি ফ্লাইট বাতিলের মধ্য দিয়ে এই ধারা শুরু হয়, এরপর মার্চ মাসের প্রায় প্রতিদিনই ২০ থেকে ৪৬টি পর্যন্ত ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বাতিলের ঘটনা ঘটে মার্চের প্রথম সপ্তাহে, যখন মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা হঠাৎ বেড়ে যায়। পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ফ্লাইট বাতিলের এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বিকল্প রুট ব্যবহার করতে হচ্ছে অনেক এয়ারলাইন্সকে। কিন্তু এসব বিকল্প পথ তুলনামূলক দীর্ঘ এবং ব্যয়বহুল হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে ফ্লাইট পরিচালনা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বাণিজ্যিক বিমান চলাচল সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ে, কারণ যাত্রীবাহী বিমানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামান্য ঝুঁকিও এড়িয়ে চলতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে।

এই পরিস্থিতির মানবিক দিকটিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত লাখো বাংলাদেশি শ্রমিক পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বা জরুরি প্রয়োজনে দেশে আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়ছেন। কেউ কেউ চিকিৎসার জন্য দেশে আসতে না পেরে উদ্বেগে রয়েছেন, আবার কেউ কর্মস্থলে ফিরতে না পেরে আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। ট্রাভেল এজেন্সিগুলো জানিয়েছে, অনেক যাত্রী একাধিকবার টিকিট রিশিডিউল করতে বাধ্য হচ্ছেন, যার ফলে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে এবং পরিকল্পনা বিঘ্নিত হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব আরও বাড়বে। শুধু বিমান চলাচল নয়, জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং পর্যটন খাতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট কমে গেলে পণ্য পরিবহনেও বিলম্ব হয়, যার ফলে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে জটিলতা তৈরি হয়।

বাংলাদেশের জন্য মধ্যপ্রাচ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক কর্মী এই অঞ্চলে কর্মসংস্থানের জন্য যাতায়াত করেন। তাই আকাশপথে দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা তৈরি হলে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। একই সঙ্গে হজ ও ওমরাহ যাত্রীদের যাতায়াতেও জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যদিও কর্তৃপক্ষ বলছে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের নিয়মিত ফ্লাইট আপডেট জানার জন্য এয়ারলাইন্সের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার পরামর্শ দিয়েছে। অনেক এয়ারলাইন্স যাত্রীদের বিকল্প তারিখ বা রুটে ভ্রমণের সুযোগ দিচ্ছে, যাতে ক্ষতি কমানো যায়। তবুও অনিশ্চয়তা কাটছে না, কারণ মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি প্রতিদিনই নতুন মোড় নিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কূটনৈতিক সমাধান ছাড়া এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফিরে না আসা পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে স্বাভাবিক গতি ফিরে আসবে না। ফলে যাত্রীদের কিছুটা ধৈর্য ধারণ করতে হতে পারে। পরিস্থিতি উন্নত হলে বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলো ধীরে ধীরে পুনরায় চালু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্বায়নের যুগে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এনেছে—এক অঞ্চলের সংঘাত কিভাবে অন্য অঞ্চলের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে। ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট বাতিলের দীর্ঘ তালিকা সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত