প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পাবনায় উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে সংক্রামক রোগ হাম। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এই ভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় অভিভাবকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক ও উদ্বেগ। জেলার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট পাবনা জেনারেল হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৮ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে ২৫ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে, যাদের অধিকাংশই শিশু। স্বাস্থ্য বিভাগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করছে বলে জানালেও চিকিৎসাসেবা নিয়ে অভিযোগ করেছেন রোগীদের স্বজনরা।
সোমবার (৩০ মার্চ) সকালে পাবনা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের পরিসংখ্যান কর্মকর্তা সোহেল রানা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ৮ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে মোট ২৫ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে, যাদের মধ্যে অধিকাংশই শিশু। আক্রান্তদের মধ্যে একজন ২২ বছর বয়সী এবং আরেকজন ৩৬ বছর বয়সী রোগীও রয়েছেন।
সরেজমিনে হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, শিশু ওয়ার্ডে রোগীর চাপ অনেক বেশি। শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় অনেক রোগীকে একই বিছানায় দুই থেকে তিনজন করে থাকতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও রোগীরা মেঝেতেও চিকিৎসা নিচ্ছেন। শিশু ওয়ার্ডের বারান্দায় কাঁচঘেরা একটি কক্ষে হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সেখানেও একাধিক রোগীকে একই শয্যায় থাকতে দেখা গেছে। এতে স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
পাবনা সদর উপজেলার আশুতোষপুর গ্রামের গৃহবধূ স্মৃতি খাতুন তার চার মাস বয়সী শিশুকে নিয়ে কয়েকদিন ধরে হাসপাতালে অবস্থান করছেন। তিনি জানান, তার শিশুর প্রথমে ঠান্ডা ও জ্বর দেখা দেয়। পরে শরীর ও মুখে লালচে গুটি দেখা দেয়। শিশুটি যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেন, শিশুটি হাম আক্রান্ত।
একই উপজেলার হারিয়াবাড়িয়া গ্রামের সুফিয়া বেগম তার ৯ মাস বয়সী নাতিকে কোলে নিয়ে হাসপাতালের করিডোরে পায়চারী করছিলেন। তিনি জানান, গত শনিবার তার নাতিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তার অভিযোগ, চিকিৎসাসেবা যথাযথভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, ডাক্তার ও নার্সদের উপস্থিতি নিয়মিত নয় এবং হাসপাতালের কক্ষগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা হচ্ছে না। এতে রোগীদের সুস্থ হয়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে মনে করেন তিনি।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অবশ্য দাবি করেছে, তাদের সামর্থ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। হাসপাতালের সহকারী পরিচালক রফিকুল হাসান বলেন, হাম একটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ এবং এটি খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তিনি বলেন, বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের চিকিৎসা দিতে বড় ধরনের সংকট নেই। তবে রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তিনি জানান, ৩৮ শয্যার শিশু ওয়ার্ডে প্রতিদিন প্রায় ২০০ রোগী ভর্তি থাকে। অথচ ওষুধ ও সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয় মাত্র ৩৮ শয্যার হিসাব অনুযায়ী।
তিনি আরও বলেন, হামের জন্য আলাদা একটি ওয়ার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে রোগীদের চিকিৎসা আরও সহজ হবে এবং সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমবে।
পাবনা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সিনিয়র পরিসংখ্যান কর্মকর্তা অংশুপতি বিশ্বাস জানান, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে জেলায় ৩৩ জনের শরীরে হামের ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, এ সময়ে মোট ১০৪টি সন্দেহভাজন ঘটনার মধ্যে ৬৬টি নমুনা পরীক্ষা করা হয় এবং ৩৩টি নমুনায় হামের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গত এক সপ্তাহেই নতুন তিনটি সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের বেশিরভাগই শিশু হলেও প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে।
হামের প্রকোপ বাড়লেও পাবনায় এই রোগের নমুনা পরীক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে রোগ নির্ণয়ের জন্য নমুনা ঢাকায় পাঠাতে হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নমুনা পাঠানো হয় মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে, যেখানে হামের পরীক্ষা করার জন্য বিশেষ ল্যাব রয়েছে। পরীক্ষার ফল পেতে প্রায় সাত দিন সময় লাগে। এই সময় রোগীদের আইসোলেশনে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়, যাতে সংক্রমণ অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে না পড়ে।
পাবনার সিভিল সার্জন ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, প্রতি বছরই কিছু সংখ্যক মানুষ হাম আক্রান্ত হয়। তবে এ বছর আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা বেশি। তিনি জনগণকে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি জানান, জেলার প্রায় প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হামের রোগী ভর্তি হচ্ছে। এ কারণে জেলার ৯টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আলাদা আইসোলেশন সেন্টার চালু করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ৯ মাস বা তার কম বয়সী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের হার বেশি। যদিও নিয়ম অনুযায়ী ৯ মাস বয়সে হামের টিকা দেওয়া হয়, তারপরও নতুন করে সংক্রমণ দেখা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, টিকাদান কার্যক্রমে কোনো ধরনের ঘাটতি থাকলে হামের মতো সংক্রামক রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই সময়মতো শিশুদের টিকা নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। তারা অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার পাশাপাশি অসুস্থ শিশুদের দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য বিভাগ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে আইসোলেশন ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।