কৃষিতে নারীর মজুরি ২৬% কম: বিবিএস জরিপ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২৬
  • ৬ বার
কৃষিতে নারীর মজুরি ২৬% কম: বিবিএস জরিপ

প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের কৃষি খাতে নারী-পুরুষ মজুরি বৈষম্যের চিত্র আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে সাম্প্রতিক এক জরিপে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, কৃষি কাজে নিয়োজিত একজন নারী শ্রমিক পুরুষ শ্রমিকের তুলনায় গড়ে ২৬ শতাংশ কম মজুরি পাচ্ছেন। এই বৈষম্য দীর্ঘদিনের হলেও সাম্প্রতিক সময়ে তা আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। জরিপে দেখা যায়, গত ডিসেম্বর মাসে একজন পুরুষ কৃষি শ্রমিক যেখানে দৈনিক গড়ে ৬২৫ টাকা মজুরি পেয়েছেন, সেখানে একজন নারী শ্রমিক পেয়েছেন মাত্র ৪৬২ টাকা।

‘শস্য পরিসংখ্যান ও কৃষি শ্রম মজুরি’ শীর্ষক জরিপ প্রতিবেদনে দেশের কৃষি শ্রমবাজারের একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। কৃষি শ্রমে নিয়োজিত ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী শ্রমিকদের মজুরির অবস্থা বোঝার জন্য নিয়মিতভাবে এই জরিপ পরিচালনা করে বিবিএস। সর্বশেষ প্রতিবেদনটি গত রোববার সংস্থাটির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। এতে দেখা যায়, কৃষি খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি কর্মক্ষেত্রে এখনও নারী শ্রমিকদের অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষি খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। অথচ এই খাতেই নারী শ্রমিকদের মজুরি বৈষম্যের হার তুলনামূলক বেশি। শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, এই ধরনের বৈষম্য মৌলিক মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তার মতে, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নারী শ্রমিকদের শ্রমমূল্য কমিয়ে দেখার প্রবণতা দীর্ঘদিনের সামাজিক কাঠামোর ফল।

তিনি আরও বলেন, দেশের অনেক অঞ্চলে নারী শ্রমিকদের পুরুষের অর্ধেক মজুরি দেওয়ার প্রবণতা এখনও রয়েছে। এতে শুধু অর্থনৈতিক বৈষম্যই নয়, সামাজিক বৈষম্যও তৈরি হচ্ছে। কম মজুরির কারণে নারীরা পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও পিছিয়ে পড়েন। ফলে তাদের ওপর পারিবারিক ও সামাজিক চাপ বাড়ে। এই বাস্তবতা নারী ক্ষমতায়নের পথে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে বলে মনে করেন শ্রম বিশেষজ্ঞরা।

বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী, কৃষি শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে অনেক ক্ষেত্রেই খোরাকির বিষয়টি যুক্ত থাকে। অর্থাৎ শ্রমিকদের দিনে এক বা একাধিক বেলা খাবার দেওয়ার প্রচলন রয়েছে। তবে খোরাকি দেওয়া হলেও নারী শ্রমিকদের মজুরি পুরুষের তুলনায় কমই থাকে। গত ডিসেম্বর মাসে দেখা গেছে, তিন বেলা খাবারসহ একজন পুরুষ শ্রমিক গড়ে ৫২৩ টাকা মজুরি পেয়েছেন, যেখানে একজন নারী শ্রমিক পেয়েছেন ৩৮৫ টাকা।

জরিপে দেখা যায়, খোরাকি থাকুক বা না থাকুক, প্রায় সব ক্ষেত্রেই নারী শ্রমিকদের মজুরি কম। অনেক জায়গায় এক বেলা বা দুই বেলা খাবারের প্রচলন রয়েছে। তবে অঞ্চলভিত্তিক এই পার্থক্য জরিপে আলাদাভাবে তুলে ধরা হয়নি। তবুও সামগ্রিকভাবে মজুরি বৈষম্যের একটি ধারাবাহিক চিত্র পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশের শ্রমবাজারে কৃষি খাতের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশের মোট শ্রমশক্তির মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ কৃষি খাতে কাজ করেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ কৃষি কাজে নিয়োজিত। এর মধ্যে বিপুলসংখ্যক নারী শ্রমিক রয়েছেন। দেশে মোট শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণকারী নারীর সংখ্যা দুই কোটির বেশি। এর বড় অংশই কৃষি ও সংশ্লিষ্ট খাতে কাজ করেন।

গবেষণা বলছে, গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও তাদের শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন হয় না। ক্যাম্পেইন ফর সাসটেইনেবল লাইভলিহুডসের তথ্য অনুযায়ী, কৃষি খাতের ২১ ধরনের কাজের মধ্যে ১৭ ধরনের কাজেই নারীরা অংশগ্রহণ করেন। অর্থাৎ কৃষিকাজের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। তবুও তাদের মজুরি তুলনামূলক কম।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষের তুলনায় তিন গুণ বেশি সময় কাজ করেন। কিন্তু এই শ্রমকে অর্থনৈতিক উৎপাদন হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। বিশেষ করে পারিবারিক কৃষিকাজে নারীদের শ্রমকে প্রায়ই অদৃশ্য শ্রম হিসেবে দেখা হয়। ফলে তাদের অবদান জাতীয় অর্থনীতিতে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না।

শ্রম সংস্কার কমিশন মনে করে, একটি জাতীয় মজুরি কাঠামো গঠন করা হলে এই বৈষম্য কমানো সম্ভব। একই কাজের জন্য নারী ও পুরুষের সমান মজুরি নিশ্চিত করার বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি অধিকার। এ ক্ষেত্রে শ্রমিকদের তথ্যভিত্তিক ডাটাব্যাংক তৈরি এবং পরিচয়পত্রের ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি জেলা পর্যায়ে শ্রমসংক্রান্ত অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট সরকারি দপ্তর প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, কৃষি খাতে নারী শ্রমিকদের মজুরি বৈষম্য কমাতে হলে শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। সচেতনতা বৃদ্ধি, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং শ্রমবাজারে সমতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে কৃষি খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং নারী শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।

এই জরিপের তথ্য আবারও মনে করিয়ে দেয়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে নারী শ্রমিকদের অবদানকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি। সমান কাজের জন্য সমান মজুরি নিশ্চিত করা গেলে শুধু নারী নয়, পুরো সমাজই উপকৃত হবে। অর্থনৈতিক সমতা প্রতিষ্ঠা পেলে দেশের উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং সামাজিক ভারসাম্য বজায় থাকবে।

নারী শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা শুধু মানবাধিকারের বিষয় নয়, এটি টেকসই উন্নয়নেরও গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলে কৃষি খাতে বিদ্যমান মজুরি বৈষম্য কমানো সম্ভব হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত