হরমুজ সংকটে তেলের দাম ২০০ ডলার ছুঁতে পারে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ, ২০২৬
  • ২ বার
২০০ ডলার ছুঁতে পারে তেলের দাম

প্রকাশঃ ৩১ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নতুন করে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে যে ধাক্কা লেগেছে, তা ইতোমধ্যেই বহুমাত্রিক সংকটের রূপ নিতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর সতর্কবার্তা বলছে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা আধুনিক ইতিহাসে নজিরবিহীন এক অর্থনৈতিক চাপে পরিণত হবে।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন ধরেই ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে। প্রতিদিন বৈশ্বিক তেল সরবরাহের একটি বড় অংশ এই প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে এই পথ কার্যত অচল হয়ে পড়ায় সরবরাহ চেইনে মারাত্মক বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ বলছে, প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল তেলের সরবরাহ কমে গেছে, যা বৈশ্বিক বাজারে সরাসরি চাপ তৈরি করছে।

এই পরিস্থিতিতে বাজারে চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য ভেঙে পড়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই দাম বাড়ার প্রবণতা দেখা দিচ্ছে। মার্কিন গণমাধ্যমগুলো এমনকি আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে দাম ২০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক সময় চাহিদা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইচ্ছাকৃতভাবে দাম বাড়তে দেওয়া হয়, যা বর্তমান সংকটের গভীরতা আরও স্পষ্ট করে।

এই জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে এশিয়ার দেশগুলোর ওপর। আমদানিনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলো ইতোমধ্যেই তীব্র চাপের মুখে পড়েছে। পাকিস্তানসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশে জ্বালানি ঘাটতি প্রকট আকার ধারণ করছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে শিল্পকারখানার কার্যক্রম পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

শুধু তেল নয়, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহেও বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। যেসব দেশ এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় অনেক দেশেই লোডশেডিং বাড়ছে এবং শিল্প উৎপাদন কমে যাচ্ছে।

ইউরোপেও পরিস্থিতি খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। সেখানে ডিজেল সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা পরিবহন খাত থেকে শুরু করে কৃষি উৎপাদন পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে প্রভাব ফেলতে পারে। ইতোমধ্যেই ইউরোপীয় দেশগুলো বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা চালাচ্ছে, তবে তা পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

জ্বালানি সংকটের এই প্রভাব শুধু শক্তি খাতেই সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি বাড়তে শুরু করেছে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পায়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় অনেক দেশ ইতোমধ্যে জ্বালানি রেশনিং চালু করেছে। মানুষকে কম জ্বালানি ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে এবং বিকল্প শক্তির ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। তবে এসব উদ্যোগ মূলত স্বল্পমেয়াদি সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বিকল্প পথে তেল সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে যে পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন হতো, তা পূরণ করা তাদের পক্ষেও সহজ নয়। ফলে সংকট পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা এখনো দূরবর্তী সম্ভাবনা বলেই মনে হচ্ছে।

এদিকে কিছু দেশ তাদের কৌশলগত তেলের মজুত ব্যবহার শুরু করেছে। জরুরি পরিস্থিতিতে এই মজুত ব্যবহার করা হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর সমাধান নয়। কারণ মজুত সীমিত এবং তা দ্রুত ফুরিয়ে যেতে পারে।

বিশ্ববাজারে এই অনিশ্চয়তার প্রভাব ইতোমধ্যেই শেয়ারবাজারেও পড়তে শুরু করেছে। বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি এড়িয়ে নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে অনেক দেশের পুঁজিবাজারে অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকটের মূল কারণ ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খেতে পারে। শুধু জ্বালানি নয়, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং শিল্প উৎপাদন—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়বে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি আরও চ্যালেঞ্জিং। জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। ফলে সরকারের জন্য বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং ভর্তুকি নীতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, হরমুজ প্রণালি ঘিরে তৈরি হওয়া এই জ্বালানি সংকট শুধু একটি আঞ্চলিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে তেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক অস্থিরতা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এখন সবার নজর কূটনৈতিক সমাধানের দিকে, কারণ সংঘাত কমানো ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণের অন্য কোনো টেকসই পথ আপাতত দেখা যাচ্ছে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত