দেশে টিকার ঘাটতিতে ঝুঁকিতে শিশুর স্বাস্থ্যব্যবস্থা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ, ২০২৬
  • ৭ বার
টিকার ঘাটতি শিশু স্বাস্থ্য ঝুঁকি

প্রকাশঃ ৩১ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশে শিশুস্বাস্থ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভগুলোর একটি হলো টিকাদান কর্মসূচি। জন্মের পর থেকেই শিশুদের নানা সংক্রামক রোগ থেকে সুরক্ষিত রাখতে নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী একাধিক টিকা দেওয়া হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এসেছে—দেশে হাম, পোলিও, যক্ষ্মাসহ ছয় ধরনের গুরুত্বপূর্ণ টিকার কেন্দ্রীয় মজুত শেষ হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতি শুধু স্বাস্থ্য খাতেই নয়, বরং সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৪০ লাখের বেশি শিশুর জন্ম হয়। এই বিপুল সংখ্যক শিশুকে সুরক্ষার আওতায় রাখতে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে ১২টি রোগ প্রতিরোধে নয় ধরনের টিকা দেওয়া হয়। জন্মের পর থেকে ১৫ মাস বয়স পর্যন্ত নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী এসব টিকা গ্রহণের মাধ্যমে শিশুরা জীবন-ঝুঁকিপূর্ণ নানা রোগ থেকে সুরক্ষা পায়। তবে বর্তমানে যেসব টিকার মজুত শেষ হয়ে গেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে হাম-রুবেলা, পোলিও, যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া, ডিপথেরিয়া-ধনুষ্টার এবং হেপাটাইটিস-বি—যা শিশুদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাস্থ্য অধিদফতর দাবি করছে, কেন্দ্রীয় মজুত শেষ হলেও মাঠপর্যায়ে এখনো কিছু টিকা রয়েছে এবং সেগুলো দিয়েই আপাতত কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় টিকা বঞ্চিত হওয়ার খবরও পাওয়া যাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

এই সংকটের পেছনে প্রশাসনিক জটিলতা এবং নীতিগত পরিবর্তনকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর স্বাস্থ্য অধিদফতরের অপারেশনাল প্ল্যান বা ওপি বাতিল হয়ে যায়। এর ফলে টিকা সংগ্রহ ও বিতরণ প্রক্রিয়ায় অচলাবস্থা তৈরি হয়। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই স্থবিরতা টিকাদান কার্যক্রমকে দুর্বল করে দেয় এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি করে।

পরবর্তীতে পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার বিশেষ বরাদ্দ দেয়। সব ধরনের টিকা সংগ্রহের জন্য প্রায় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়, যার মধ্যে শিশুদের টিকার জন্য রাখা হয় ৮৪২ কোটি টাকা। এই বরাদ্দ থেকে টিকা সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা বাধা সামনে আসে।

প্রথমদিকে টিকা সংগ্রহের জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি ক্রয় করা হতো। কিন্তু পরে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে অর্ধেক টিকা সরাসরি ইউনিসেফ থেকে এবং বাকি অর্ধেক ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে কেনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এই পরিবর্তন বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় লেগে যায় এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে পুরো কার্যক্রম বিলম্বিত হয়। ফলে টিকার সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দেয়।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান এই পরিস্থিতিকে ‘নীতিগত জটিলতার ফল’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর সেটি বাতিল করা হলেও বিকল্প কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি, যার ফল এখন ভোগ করতে হচ্ছে। তিনি জানিয়েছেন, বর্তমানে আবারও সরাসরি ক্রয়ের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যাতে দ্রুত এই সংকট কাটিয়ে ওঠা যায়।

এই পরিস্থিতির মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো দেশে হামের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়া। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন এলাকায় হাম আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়ছে এবং মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। টিকার ঘাটতির কারণে যদি এই রোগের বিস্তার আরও বেড়ে যায়, তাহলে তা একটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কর্মসূচি শুধু ব্যক্তিগত সুরক্ষা নয়, বরং সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে পর্যাপ্ত সংখ্যক মানুষ টিকা না পেলে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা সামষ্টিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে সংক্রামক রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

এই প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, টিকার সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে জরুরি অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে টিকাদান কার্যক্রম যাতে বন্ধ না হয়, সেদিকেও বিশেষ নজর দিতে হবে। প্রয়োজন হলে বিকল্প উৎস থেকে দ্রুত টিকা সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলছেন তারা।

অভিভাবকদের মধ্যেও এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অনেকেই নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী সন্তানের টিকা দিতে না পারায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। চিকিৎসকরা বলছেন, টিকার সময়সূচিতে বড় ধরনের ব্যত্যয় হলে তা শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই যত দ্রুত সম্ভব টিকার সরবরাহ স্বাভাবিক করা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে টিকার এই ঘাটতি একটি সাময়িক সমস্যা হলেও এর প্রভাব হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি। সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ না নিলে তা শিশুস্বাস্থ্য এবং দেশের সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। এখন প্রয়োজন দ্রুত, কার্যকর এবং সমন্বিত উদ্যোগ, যাতে দেশের প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় এনে নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা যায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত