জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে দেশের হাহাকার বেড়েছে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১০৯ বার
তীব্র জ্বালানি সংকটে দেশ

প্রকাশঃ ০১ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশজুড়ে তীব্র জ্বালানি তেলের সংকট ক্রমেই ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। ঢাকার সড়ক থেকে প্রান্তিক অঞ্চলের প্রতিটি পেট্রোল পাম্পের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানবাহন দাঁড়িয়ে তেলের জন্য অপেক্ষা করছে। অনেকে জরুরি কাজে গাড়ি চালাতে পারছেন না, আবার কিছু মানুষ তেলের আশায় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত তেল না পেয়ে হতাশা ও অসহায়তার শিকার হচ্ছেন। রাজধানীসহ বিভিন্ন শহর ও মহাসড়কগুলোতে যানবাহনের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। এই পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করেছে।

সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য দাবি করা হচ্ছে, দেশে এক লাখ ৯২ হাজার ৯১৯ টন জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে। গতকাল সরকারি ক্রয় কমিটি আরও দেড় লাখ টন তেল আমদানের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানাচ্ছে, দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক এবং গত বছরের তুলনায় এবার ২৫ শতাংশ বেশি তেল আমদানি করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি মূল্যের অস্থিরতা সত্ত্বেও সরকার দেশে তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তবে মাঠের চিত্র সরকারের তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ঢাকা শহরের বিভিন্ন পাম্পের সঙ্গে সরেজমিন দেখা গেছে, অধিকাংশ পাম্প বন্ধ। খোলা থাকা পাম্পেও পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ হচ্ছে না। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই সংকটকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। চুয়াডাঙ্গায় এমনই একটি ঘটনার মধ্যে একজনের প্রাণওহানি হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে এটি অবৈধ মজুতদারি, কালোবাজারি ও অতিরিক্ত কেনাকাটিকে দায়ী করা হচ্ছে। কর্মকর্তাদের মতে, শহর থেকে প্রান্তিক এলাকার বিভিন্ন পাম্পে জ্বালানি তেল অবৈধভাবে মজুত করা হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় তিন লাখ লিটার তেল উদ্ধার এবং মজুতদারদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে।

পেট্রোল পাম্প মালিকদের বক্তব্যের মধ্যে রয়েছে, সরবরাহের তুলনায় তারা অর্ধেকেরও কম তেল পাচ্ছেন। দেশের দুই হাজারের বেশি পাম্পের অধিকাংশে নিরবচ্ছিন্নভাবে তেল সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। দিনের বেশিরভাগ সময় পাম্পগুলো বন্ধ রাখতে হচ্ছে, ফলে গ্রাহক ও মালিকদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। পাম্প মালিকরা নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সকাল ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত বিক্রয় সময় নির্ধারণ করা এবং তেল সরবরাহকে স্থিতিশীল করতে সরকারের কাছে আট দফা দাবি জানিয়েছেন।

সরকার এই সংকটকে কৃত্রিম বলে উল্লেখ করছে। যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী জানান, আন্তর্জাতিক ঘটনায় আতঙ্কিত গ্রাহকরা বেশি করে জ্বালানি সংগ্রহ করেছেন, যার ফলে সিস্টেমে সমস্যা তৈরি হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের মাধ্যমে শিগগিরই এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।

বর্তমানে দেশে ডিজেলের মজুত এক লাখ ২৮ হাজার ৯৩৯ টন, অকটেন সাত হাজার ৯৪০ টন, পেট্রোল ১১ হাজার ৪৩১ টন এবং জেট ফুয়েল ৪৪ হাজার ৬০৯ টন রয়েছে। সরকার নিয়মিত আমদানির মাধ্যমে সরবরাহ অব্যাহত রাখছে। হজ মৌসুমকে সামনে রেখে জেট ফুয়েলের মজুত পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে। জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, দেশে সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে এবং চাহিদার তুলনায় আমদানি বৃদ্ধি করা হয়েছে।

মালিকদের অভিজ্ঞতা প্রতিফলিত করছে, ঢাকা শহরের কারওয়ান বাজার পর্যন্ত পথে সাত থেকে আটটি পাম্পে তেলের জন্য দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে। কেউ কোনো তেল না পেয়ে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন, কেউ আবার সামান্য তেল কিনতে পারছেন, তবে তা যথেষ্ট নয়। পাম্পে সহিংসতা, হামলা ও কর্মীদের নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। মালিকরা জানান, প্রতিটি পাম্পে দীর্ঘ সারি তৈরি হলে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থাকে।

সরকার অবৈধ মজুত ও কালোবাজারি রোধে কঠোর অভিযান চালাচ্ছে। এ পর্যন্ত তিন হাজার ৫৫৯টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে এবং দুই লাখ ৯৬ হাজার ৩০৫ লিটার তেল উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযানে এক হাজার ২৪৪টি মামলা হয়েছে, ৮৪ লাখ ৫১ হাজার টাকা অর্থদণ্ড আর ১৯ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। শুধু ৩০ মার্চ একদিনে ৮৭ হাজার ৭০০ লিটার তেল উদ্ধার করা হয়েছে।

সরকার জরুরি ভিত্তিতে আরও দুই লাখ ৬০ হাজার টন তেল ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার মধ্যে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল এবং এক লাখ ৬০ হাজার টন ডিজেল। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে ভর্তুকি দিয়ে দাম স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। রাশিয়া থেকে ছয় লাখ টন তেলের আমদানি অনুমতি চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। ভারত থেকে ২২ হাজার টন ডিজেল আগেই এসেছে। এছাড়া ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, নাইজেরিয়া, আজারবাইজান, কাজাখস্তান, অ্যাঙ্গোলা, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন উৎসের সঙ্গে সরবরাহ নিয়ে আলোচনা চলছে।

সংকট চলমান থাকলেও সরকারের চেষ্টা, মজুত বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের মাধ্যমে তেলের সরবরাহকে স্থিতিশীল রাখা। তবে মাঠের চিত্র ও নাগরিকদের প্রতিক্রিয়া এই সংকট কতটা বাস্তব এবং তা কত দ্রুত সমাধান হবে, তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com