প্রকাশ: ৩ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলায় অবৈধভাবে তেল নামানোর সময় প্রায় সাড়ে চার হাজার লিটার ডিজেল জব্দ করেছে পুলিশ। গভীর রাতে পরিচালিত এক অভিযানে লরি বোঝাই এই তেল জব্দ করা হয়, যা স্থানীয়ভাবে চোরাচালান বা অবৈধ বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) রাত প্রায় আড়াইটার দিকে গাংনী উপজেলার সাহেবনগর বাজার এলাকায় একটি লরি থেকে অবৈধভাবে তেল নামানো হচ্ছে— এমন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে অংশ নেন গাংনী থানা পুলিশের একটি দল। ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ দেখতে পায়, ঝিনাইদহ নিবন্ধিত ঢ ৪১-০০৪৩ নম্বরের একটি লরি থেকে তেল নামানো হচ্ছে এবং তা স্থানীয় একটি দোকানের ব্যারেলে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। দোকানটি রিপন নামের এক সার ও কীটনাশক ব্যবসায়ীর বলে জানা গেছে।
প্রাথমিকভাবে ঘটনাস্থল থেকেই প্রায় ৬০০ লিটার ডিজেল জব্দ করা হয়, যা ইতোমধ্যে ব্যারেলে সংরক্ষিত ছিল। একইসঙ্গে লরিতে থাকা বাকি তেলসহ পুরো গাড়িটি জব্দ করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পুলিশের দাবি, অভিযানের সময় লরির সঙ্গে প্রয়োজনীয় বৈধ কাগজপত্র পাওয়া যায়নি, যা ঘটনাটিকে আরও সন্দেহজনক করে তুলেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, তেল পরিবহন সংক্রান্ত বৈধ কাগজপত্র ছাড়া এত বিপুল পরিমাণ জ্বালানি স্থানান্তর করা আইনবিরোধী এবং এর পেছনে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় থাকতে পারে।
গাংনী থানার উপ-পরিদর্শক আব্দুল করিম জানান, লরিটি খুলনার একটি ডিপো থেকে ডিজেল নিয়ে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে যাওয়ার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত গন্তব্যে যাওয়ার পরিবর্তে মাঝপথে তেল নামানোর চেষ্টা করা হচ্ছিল, যা সন্দেহের সৃষ্টি করে। তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে যে, সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে অবৈধভাবে তেল বিক্রি বা মজুত করার উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তবে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য কাগজপত্র যাচাই ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সাহেবনগর বাজার এলাকায় গভীর রাতে হঠাৎ করে একটি লরি থেকে তেল নামানোর বিষয়টি অনেকের নজরে আসে। এ ধরনের কার্যক্রম সাধারণত নির্ধারিত ডিপো বা অনুমোদিত পয়েন্ট ছাড়া করা হয় না। ফলে ঘটনাটি স্থানীয়দের মধ্যেও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, অবৈধভাবে জ্বালানি মজুত বা বিক্রির কারণে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে, যা সাধারণ মানুষের জন্য ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশে জ্বালানি তেল একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পণ্য, যার সরবরাহ ও মূল্য দেশের অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত বা চোরাচালান কেবল সরকারের রাজস্ব ক্ষতিই করে না, বরং বাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি করে। বিশেষ করে কৃষি, পরিবহন ও শিল্প খাতে ডিজেলের চাহিদা বেশি হওয়ায় এই জ্বালানির সরবরাহ ব্যাহত হলে তার প্রভাব বহুমাত্রিকভাবে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জ্বালানি তেল পরিবহন ও বিপণন ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করা গেলে এ ধরনের অনিয়ম অনেকাংশে কমানো সম্ভব। একইসঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিয়মিত নজরদারি ও কঠোর ব্যবস্থা অবৈধ বাণিজ্য প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। সম্প্রতি বিভিন্ন জেলায় জ্বালানি তেল সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যাওয়ায় বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।
গাংনী থানার পুলিশ জানিয়েছে, জব্দ করা লরি ও তেলের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। বৈধ কাগজপত্র উপস্থাপন করতে না পারলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একইসঙ্গে এই ঘটনার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তারা বলছে, জ্বালানি তেলের অবৈধ বাণিজ্য রোধে স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সন্দেহজনক কার্যক্রম চোখে পড়লে তা দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে আহ্বান জানানো হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হলে অবৈধ ব্যবসা কমে আসবে এবং বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে। একইসঙ্গে তারা আশা করছেন, এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়ানোর সাহস না পায়।
বর্তমানে জব্দ করা তেল ও লরিটি গাংনী থানার হেফাজতে রয়েছে। তদন্ত শেষে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।