প্রকাশ: ৩ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশে আবারও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে হামের সংক্রমণ। রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতি বা ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি হওয়ায় শিশুদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এই সংক্রামক রোগ। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যমতে, চলতি মাসের প্রথম দিনেই হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ৬৮৫ জন শিশু। যদিও পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ২৬ জনের ক্ষেত্রে, তবে সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে মোট সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৭০৯ জনে। এদের মধ্যে ৫৮৫ জনের ক্ষেত্রে হাম নিশ্চিত হয়েছে। সংক্রমণের বিস্তার দেশের প্রায় সব জেলাতেই দেখা যাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটার কারণে অনেক শিশুর মধ্যে প্রয়োজনীয় রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়নি। এর ফলে একটি বড় অংশ ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’-এর মধ্যে পড়ে গেছে, যা সংক্রামক রোগের বিস্তারকে ত্বরান্বিত করছে। করোনা মহামারির সময় অনেক পরিবার শিশুদের নিয়মিত টিকা প্রদান থেকে পিছিয়ে পড়ে। পরবর্তীতে সেই ঘাটতি পূরণ না হওয়ায় বর্তমানে হামসহ অন্যান্য প্রতিরোধযোগ্য রোগের ঝুঁকি বেড়েছে।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা সাধারণত শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং শরীরে লালচে ফুসকুড়ি ওঠা এর প্রধান লক্ষণ। অনেক ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া বা মস্তিষ্কে সংক্রমণের মতো গুরুতর সমস্যা তৈরি হতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, সময়মতো চিকিৎসা না পেলে এই রোগ প্রাণঘাতীও হতে পারে।
হামের সংক্রমণ রোধে সরকার ইতোমধ্যে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, আগামী রোববার থেকে সারা দেশে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হবে। প্রাথমিকভাবে যেসব এলাকায় সংক্রমণের হার বেশি, সেখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা দেওয়া হবে। এই কর্মসূচির আওতায় ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের টিকা প্রদান করা হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, দ্রুত এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা গেলে সংক্রমণের হার কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সময়মতো টিকা গ্রহণ নিশ্চিত করা। সাধারণত জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় শিশুদের নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী হাম প্রতিরোধী টিকা দেওয়া হয়। তবে কোনো কারণে যদি নির্ধারিত সময়ের টিকা মিস হয়ে যায়, তাহলে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করে তা গ্রহণ করা উচিত। একইসঙ্গে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাও গুরুত্বপূর্ণ।
অভিভাবকদের প্রতি বিশেষভাবে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। শিশুদের জ্বর বা ফুসকুড়ির মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখার পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে, যাতে সংক্রমণ ছড়িয়ে না পড়ে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি দেশের টিকাদান কর্মসূচি যত বেশি শক্তিশালী হবে, সংক্রামক রোগের ঝুঁকি তত কম থাকবে। তারা মনে করেন, নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় টিকা সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করা এবং অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করছে। সংক্রমণের হার কমাতে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং স্থানীয় প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে বলা হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, টিকাদানের হার কমে গেলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। তাই এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তারা মনে করেন, সরকারের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়িত হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুদের মৃত্যু নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। তবে সময়মতো সচেতনতা বৃদ্ধি এবং টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা গেলে এই ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দ্রুত এই পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষিত রাখা যাবে।