প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বজুড়ে বায়ুদূষণ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই সর্বশেষ বায়ুগুণমান সূচকে আবারও শীর্ষে উঠে এসেছে ভারতের রাজধানী Delhi। আন্তর্জাতিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণ সংস্থা IQAir-এর প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, বিশ্বের ১২০টি দেশের শহরের মধ্যে দিল্লির বাতাস সবচেয়ে বেশি দূষিত অবস্থায় রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের রাজধানী Dhaka তালিকার ১৬তম স্থানে রয়েছে, যেখানে বাতাসের মান ‘সহনীয়’ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
শুক্রবার সকাল ১০টা ২০ মিনিটে প্রকাশিত সূচক অনুযায়ী দিল্লির বায়ুর মান বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই তালিকায় ২৪৪ স্কোর নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে থাইল্যান্ডের Chiang Mai, যার বাতাসকে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে চীনের Beijing, যেখানে বায়ুর মান ১৯৮ স্কোর নিয়ে ‘অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ে রয়েছে। তালিকার চতুর্থ স্থানে উঠে এসেছে ভিয়েতনামের রাজধানী Hanoi, যার বায়ুর মান ১৫৯ স্কোর নিয়ে অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
একই সময়ে ৯৯ স্কোর নিয়ে তালিকার ১৬তম স্থানে থাকা ঢাকার বাতাস তুলনামূলকভাবে সহনীয় অবস্থায় রয়েছে বলে জানিয়েছে আইকিউএয়ার। যদিও এই মান পুরোপুরি নিরাপদ নয়, তবে অন্যান্য শীর্ষ দূষিত শহরের তুলনায় পরিস্থিতি কিছুটা স্বস্তিদায়ক বলে মনে করছেন পরিবেশ বিশ্লেষকরা।
বিশ্বব্যাপী বায়ুদূষণের মাত্রা নির্ধারণে আইকিউএয়ারের এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স বা একিউআই একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। সংস্থাটির মানদণ্ড অনুযায়ী, শূন্য থেকে ৫০ স্কোরের মধ্যে থাকলে বায়ুর মান ভালো হিসেবে ধরা হয়। ৫১ থেকে ১০০ স্কোর হলে তা মাঝারি বা সহনীয় বলে বিবেচিত হয়। ১০১ থেকে ১৫০ স্কোর সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর হিসেবে ধরা হয়, আর ১৫১ থেকে ২০০ স্কোর হলে তা সাধারণ মানুষের জন্যও অস্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠে। ২০১ থেকে ৩০০ স্কোরকে খুব অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং ৩০১-এর বেশি হলে তা দুর্যোগপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দিল্লির বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ হলো যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পকারখানার নির্গমন, নির্মাণকাজের ধুলাবালি এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানো। শীত মৌসুমে আবহাওয়ার কারণে দূষিত কণাগুলো বাতাসে আটকে থাকে, ফলে দূষণের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। একই ধরনের সমস্যা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক শহরেই দেখা যায়, যেখানে দ্রুত নগরায়ণ এবং শিল্পায়নের ফলে পরিবেশের ওপর চাপ বাড়ছে।
পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদে বায়ুদূষণের প্রভাব মানবস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হতে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য দূষিত বাতাস বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। বায়ুদূষণের কারণে অ্যাজমা, ব্রঙ্কাইটিস, হৃদরোগ এমনকি ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
ঢাকার ক্ষেত্রেও বায়ুদূষণ একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। ইটভাটা, যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ এ সমস্যার প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। শীত মৌসুমে বৃষ্টিপাত কম থাকায় বাতাসে ধুলাবালি জমে থাকে, ফলে দূষণের মাত্রা বাড়ে। যদিও সর্বশেষ সূচকে ঢাকার অবস্থান তুলনামূলকভাবে ভালো, তবুও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন পরিস্থিতির উন্নতি ধরে রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বায়ুদূষণ বর্তমানে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষ দূষিত বায়ুর কারণে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহার, গণপরিবহন উন্নয়ন এবং শিল্পকারখানায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে শহরাঞ্চলে সবুজায়ন বাড়ানো এবং নির্মাণকাজে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি অনুসরণের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক সূচকে দিল্লির বায়ুদূষণ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও ঢাকার বাতাস তুলনামূলকভাবে সহনীয় অবস্থায় রয়েছে। তবে পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, এ পরিস্থিতিকে স্থায়ী উন্নতিতে পরিণত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। অন্যথায় ভবিষ্যতে দূষণের মাত্রা আবারও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।