প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সরকার দেশের জ্বালানি সাশ্রয় এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধে উদ্ভূত প্রভাব মোকাবিলায় একগুচ্ছ কৃচ্ছ্রসাধনমূলক এবং ব্যয় সংকোচনমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এই সিদ্ধান্তগুলো সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যাংক, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবহন এবং আলোসজ্জাসহ বিভিন্ন খাতে প্রযোজ্য হবে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি বৃহস্পতিবার রাতে জাতীয় সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর সাংবাদিকদের জানান, এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য জ্বালানি ব্যবহার কমানো এবং বাজেটে সমন্বয় আনা।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সরকারি ও বেসরকারি অফিসের কার্যদিবস এক ঘণ্টা কমিয়ে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যাংকগুলো সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত খোলা থাকবে, তবে সকল আনুষঙ্গিক কাজ সম্পন্ন করতে বিকাল ৪টায় ব্যাংক বন্ধ হবে। দেশের সব মার্কেট, দোকানপাট ও শপিংমল সন্ধ্যা ৬টার পর বন্ধ রাখতে হবে। তবে কাঁচাবাজার, ওষুধের দোকান এবং খাবারের দোকানসহ জরুরি সেবাগুলো এই নির্দেশনার আওতামুক্ত থাকবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এই নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ করছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পৃথক নির্দেশনা দেওয়া হবে, যা আগামী রোববার থেকে কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমাতে এবং যানজট হ্রাস করতে সরকারের পক্ষ থেকে শুল্কমুক্ত ‘ইলেকট্রিক বাস’ আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেসব স্কুল এই উদ্যোগে অংশ নেবে তারা বিশেষ সুবিধা পাবে। বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও নতুন ইলেকট্রিক বাস আমদানিতে শুল্ক ২০ শতাংশ কমানো হয়েছে, তবে কোনো পুরনো বাস আমদানি অনুমোদিত নয়।
জ্বালানি সংকটের এই সময়ে বিয়ে বা উৎসব-অনুষ্ঠানে আলোকসজ্জা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের সকল বিদেশ ভ্রমণ এবং অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণের ৫০ শতাংশ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সভা-সেমিনারের আপ্যায়ন খরচও ৫০ শতাংশ হ্রাস করা হয়েছে। তাছাড়া সরকারি যানবাহন এবং কম্পিউটার সামগ্রী কেনা আগামী তিন মাসের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে। জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতের বাজেট থেকে ৩০ শতাংশ ব্যয় কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে তেলের সরবরাহে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সরকারের বিকল্প উদ্যোগ হিসেবে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং কাজাখস্তান থেকে তেল আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সচিব জানান, সরকার সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘবে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি অব্যাহত রাখছে এবং এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কর্মসূচি এবং ব্যয় সংকোচনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে জ্বালানি খাতে চাপ কমবে এবং সরকারি ও বেসরকারি খাতের কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। শিক্ষা ও পরিবহণ খাতে নেওয়া পদক্ষেপ শিশুর নিরাপত্তা ও যানজট কমাতে সহায়তা করবে।
এছাড়া বাজার ও বিপণিবিতানকে সংরক্ষিত রাখা হলেও সন্ধ্যা ৬টার পর বন্ধ রাখার নির্দেশনার মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ নিয়ন্ত্রণে থাকবে। ইলেকট্রিক বাসের আমদানির মাধ্যমে পরিবহন খাতে নবায়নযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
সচিব জানান, সরকারের পদক্ষেপগুলো মানুষকে দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি প্রভাবিত করবে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের জ্বালানি সাশ্রয় এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা বজায় রাখার জন্য সব ধরনের পরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।
জ্বালানি সাশ্রয় ও ব্যয় সংকোচনের এই উদ্যোগ দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ, বাজেট ভারসাম্য এবং পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারের পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে উদ্ভূত প্রভাব দেশজুড়ে কমবে এবং দেশের সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন জীবনে স্বাভাবিক রূপে ফিরে আসতে পারবে।