প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় তিনজনের প্রাণহানির ঘটনায় আবারও প্রশ্নের মুখে পড়েছে দেশের মহাসড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। শুক্রবার (৩ এপ্রিল) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে হাটিকুমরুল-ঢাকা মহাসড়কের নলকা এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে গেলে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই তিনজন নিহত হন এবং আহত হন অন্তত ১০ জন, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকাগামী বাসটি যমুনা সেতুর পশ্চিম সংযোগ সড়ক দিয়ে আসছিল। নলকা গ্যাস অফিসের সামনে পৌঁছালে হঠাৎ করেই বাসটির চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। দ্রুতগতির কারণে বাসটি মহাসড়কের আইল্যান্ডে ধাক্কা খেয়ে উল্টে যায়। মুহূর্তেই পুরো এলাকা আতঙ্কে ভরে ওঠে। বিকট শব্দে স্থানীয় লোকজন ছুটে এসে দেখতে পান, বাসটি উল্টে পড়ে আছে এবং যাত্রীরা কেউ ভেতরে আটকে, কেউ বা ছিটকে পড়ে আহত অবস্থায় কাতরাচ্ছেন।
নিহতদের মধ্যে দুজনের পরিচয় নিশ্চিত করেছে পুলিশ। তারা হলেন রায়গঞ্জ উপজেলার চান্দাইকোনা এলাকার রাখি বেগম এবং নওগাঁর বদলগাছি উপজেলার রাকিবুল ইসলাম। অপর একজনের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। নিহতদের স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এমন আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারগুলোর কান্না ও আর্তনাদ হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।
যমুনা সেতু পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিরুল ইসলাম জানান, দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। বাসের ভেতরে আটকে পড়া যাত্রীদের উদ্ধার করতে স্থানীয় লোকজনও এগিয়ে আসেন। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে নিকটবর্তী হাসপাতালগুলোতে পাঠানো হয়। তবে আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই দুর্ঘটনার পর কিছু সময়ের জন্য মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। দুর্ঘটনাকবলিত বাসটি সড়কের ওপর পড়ে থাকায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও উদ্ধারকারী দলের প্রচেষ্টায় বাসটি সরিয়ে নেওয়া হলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই মহাসড়কে প্রায়ই বেপরোয়া গতিতে যান চলাচল করে, যা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। বিশেষ করে দূরপাল্লার বাসগুলো সময় বাঁচাতে অতিরিক্ত গতিতে চলাচল করে এবং অনেক সময় চালকদের অসতর্কতার কারণেও এমন দুর্ঘটনা ঘটে। তারা মনে করেন, কঠোর নজরদারি ও নিয়ম প্রয়োগ ছাড়া এসব দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।
সড়ক দুর্ঘটনা বাংলাদেশে একটি বড় জননিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন, আহত হচ্ছেন আরও অনেক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চালকদের প্রশিক্ষণের অভাব, যানবাহনের ফিটনেস সমস্যা, ট্রাফিক আইন না মানা এবং সড়ক অবকাঠামোর দুর্বলতা—এসবই দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। এ ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
এদিকে এই দুর্ঘটনার পর নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা। আহতদের চিকিৎসার সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে একটি তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, প্রতিটি দুর্ঘটনার পর তদন্ত ও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে খুব বেশি পরিবর্তন দেখা যায় না। ফলে একই ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দেয়, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। প্রতিটি প্রাণ অমূল্য, আর সেই প্রাণ রক্ষায় দায়িত্বশীলতা, সচেতনতা এবং কার্যকর পদক্ষেপের বিকল্প নেই। সরকারের পাশাপাশি চালক, যাত্রী এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে একযোগে দায়িত্ব পালন করতে হবে, তাহলেই হয়তো ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হবে।