প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক অস্ত্র ছিল ফাইজারের কোভিড-১৯ টিকা। কোটি কোটি মানুষ এই টিকা গ্রহণ করে নতুন আশার আলো দেখেছিলেন। তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এই বহুল ব্যবহৃত টিকাটির এমন একটি সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার বিষয় উঠে এসেছে, যা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন চক্ষু বিশেষজ্ঞসহ স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীরা। গবেষণা বলছে, ফাইজারের টিকা কর্নিয়ার গঠনে পরিবর্তন আনতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে চোখের দৃষ্টিশক্তির জন্য হুমকিস্বরূপ হতে পারে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইলে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, তুরস্কের বিজ্ঞানীরা এই টিকার প্রভাব নিয়ে একটি বিস্তৃত গবেষণা করেছেন। গবেষণায় অংশগ্রহণকারী ৬৪ জন ব্যক্তির চোখ টিকা নেওয়ার আগে এবং দ্বিতীয় ডোজের দুই মাস পরে পর্যবেক্ষণ করা হয়। ফলাফল ছিল যথেষ্ট উদ্বেগজনক।
গবেষণায় দেখা গেছে, ফাইজারের টিকা গ্রহণের পর কর্নিয়ার পুরুত্ব বেড়ে যায়। কর্নিয়ার স্বচ্ছতা ধরে রাখার জন্য দায়ী এন্ডোথেলিয়াল কোষের সংখ্যা হ্রাস পায় এবং কোষগুলোর স্বাভাবিক গঠনে বিভ্রাট দেখা দেয়। কর্নিয়ার পুরুত্ব যেখানে টিকা নেওয়ার আগে ছিল গড়ে ৫২৮ মাইক্রোমিটার, তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৪২ মাইক্রোমিটারে— যা প্রায় ২ শতাংশ বৃদ্ধি। এই পরিবর্তন চোখের স্বচ্ছতা হ্রাসের ইঙ্গিত হতে পারে এবং ঝাপসা দেখার মতো উপসর্গ সৃষ্টি করতে পারে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে পরিবর্তন দেখা গেছে, তা হলো এন্ডোথেলিয়াল কোষের ঘনত্বে উল্লেখযোগ্য পতন। এই কোষগুলো কর্নিয়াকে স্বচ্ছ ও কর্মক্ষম রাখতে মূল ভূমিকা পালন করে। গবেষণায় দেখা যায়, প্রতি বর্গমিলিমিটারে কোষের সংখ্যা গড়ে ২ হাজার ৫৯৭ থেকে নেমে আসে ২ হাজার ৩৭৮-এ— যা প্রায় ৮ শতাংশ হ্রাস। এই হ্রাস এখনও নিরাপদ সীমার মধ্যে থাকলেও, যাদের চোখে আগেই কোনো সমস্যা রয়েছে বা যাদের এ ধরনের কোষ কম রয়েছে, তাদের জন্য এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ সংকেত হতে পারে।
এছাড়াও, কোষের স্বাভাবিক হেক্সাগোনাল (ছয়কোনা) গঠনের হার হ্রাস পায় এবং কোষের আকারে বৈচিত্র্য বেড়ে যায়। গবেষণা বলছে, কোষের এই অস্বাভাবিকতার পেছনে কারণ হতে পারে প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়া বা কোষের চাপজনিত প্রতিক্রিয়া। কোষের আকারের বৈচিত্র্য পরিমাপ করতে ব্যবহৃত “কোইফিসিয়েন্ট অব ভ্যারিয়েশন” বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৯ থেকে ৪২ শতাংশে, যা কোষে অস্বাভাবিকতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
তবে গবেষণায় দৃষ্টিশক্তিতে কোনো তাত্ক্ষণিক ক্ষতির প্রমাণ মেলেনি। অংশগ্রহণকারীদের চোখের দৃষ্টি, চোখের চাপ এবং সামগ্রিক চোখের স্বাস্থ্য পরীক্ষায় কোনো বড় ধরণের সমস্যা ধরা পড়েনি। কিন্তু গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এই পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে কী ধরনের জটিলতা তৈরি করতে পারে, তা জানতে আরও বিস্তৃত গবেষণা দরকার। বিশেষ করে যাদের চোখে অস্ত্রোপচার হয়েছে বা কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকির মাত্রা আরও বেশি হতে পারে।
গবেষণাটি অত্যন্ত নিখুঁত পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের চোখ সিরিয়াস কর্নিয়াল টোপোগ্রাফি ও তোমে ইএম-৪০০০ স্পেকুলার মাইক্রোস্কোপি যন্ত্রের সাহায্যে বিশ্লেষণ করা হয়। এই যন্ত্রগুলো কর্নিয়ার পুরুত্ব, কোষের বিন্যাস ও গঠন এবং স্বাস্থ্য বিশ্লেষণে ব্যবহার হয়। গবেষণাটি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক মহলে আলোড়ন তুলেছে এবং নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে— টিকাদানের সুফল ও ঝুঁকির ভারসাম্য নিয়ে।
তবে গবেষকরা পরিষ্কারভাবে বলছেন, এই তথ্যের ভিত্তিতে ফাইজারের টিকা গ্রহণ বন্ধ করার কোনো পরামর্শ তাঁরা দিচ্ছেন না। বরং তারা বলছেন, যেসব ব্যক্তির চোখে আগে থেকেই কোনো সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে কর্নিয়ার স্বাস্থ্য সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণে রাখা উচিত। টিকাদানের উপকারিতা এখনও বিশাল, কিন্তু তার সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো নজরে রাখা ও গবেষণা চালিয়ে যাওয়াও সমান জরুরি।
এই গবেষণা বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের আলোকে গুরুত্বপূর্ণ এক দিক উন্মোচন করেছে। যদিও এটি আপাতত সীমিত পরিসরের গবেষণা, তবে এর ফলাফল ভবিষ্যতের জন্য একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী যেখানে টিকা গ্রহণের হার এখনো গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যনীতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখছে, সেখানে এমন গবেষণা টিকাদান নীতিমালার আরও উন্নয়ন ও সুরক্ষার পথে সহায়ক হতে পারে।
একটি বাংলাদেশ অনলাইন