প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা
একটি বাংলাদেশ অনলাইন
গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর নিষ্ঠুর হামলা ফের প্রাণ কেড়ে নিলো বহু নিরীহ ফিলিস্তিনির। রোববার জাতিসংঘের ত্রাণ সহায়তা বিতরণকারী একটি ট্রাকের কাছে ভিড় করেছিল বাস্তুচ্যুত ও ক্ষুধার্ত মানুষ, যারা যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে চেয়েছিল একমুঠো খাবারের আশায়। কিন্তু সেই মানবিক মুহূর্তেই ইসরায়েলি বাহিনীর চালানো গুলিতে মৃত্যু হলো অন্তত ৬৭ জনের। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই হৃদয়বিদারক ঘটনার তথ্য নিশ্চিত করেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, আহত ও নিহতরা সবাই খাদ্য সংগ্রহে এসেছিলেন। গুলিবর্ষণের দৃশ্য ছিল যেন একতরফা নিধনযজ্ঞ। তাদের ভাষায়, এটি ছিল খাদ্যের জন্য অপেক্ষমান সাধারণ মানুষের ওপর চালানো সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়ংকর হামলাগুলোর একটি। নিহতদের মধ্যে শনিবার সংঘটিত আরেকটি হামলায় নিহত ৩৬ জনও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে জানা গেছে, যার ফলে এই সংখ্যা আরও বিভীষিকাময় রূপ ধারণ করে।
উত্তর গাজার ওই হামলায় বহু মানুষ আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ, ইসরায়েল যুদ্ধকবলিত অঞ্চল থেকে মানুষকে সরিয়ে নিতে বললেও, সেই সুযোগেই পরিকল্পিতভাবে চালানো হচ্ছে হামলা।
অন্যদিকে, দক্ষিণ গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর আরেকটি হামলায় ছয়জন ফিলিস্তিনি নিহত হন। যদিও এই হামলার বিষয়ে ইসরায়েলি বাহিনী এখনও কোনো মন্তব্য করেনি বা ব্যাখ্যা দেয়নি।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, তারা মানবিক ত্রাণ বিতরণকারী ট্রাককে লক্ষ্য করে ইচ্ছাকৃত গুলি চালায়নি। বরং উত্তর গাজায় “তাৎক্ষণিক হুমকি” মনে করে “সতর্কতামূলক গুলি” চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে তারা। সেই সঙ্গে এটিও বলা হয়েছে যে, নিহতের সংখ্যা বাড়িয়ে বলা হচ্ছে।
তবে এসব ব্যাখ্যা বিশ্ববাসীকে শান্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) এক বিবৃতিতে জানায়, ২৫টি ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই হাজার হাজার ক্ষুধার্ত মানুষের ভিড় জমে। ঠিক তখনই শুরু হয় গুলিবর্ষণ। ডব্লিউএফপি এই হামলাকে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
হামাসের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, ইসরায়েলি হামলা এবং চরম খাদ্য সংকটে ফিলিস্তিনিরা দিন দিন বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই পরিস্থিতি কাতারে চলমান যুদ্ধবিরতির আলোচনা প্রক্রিয়ার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে কেবল মানবিক বিপর্যয়ই নয়, বন্ধ হতে পারে সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমাধানের পথও।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শুধু রোববার ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর গুলিবর্ষণ ও বিমান হামলায় নিহতের সংখ্যা ৯০ ছাড়িয়েছে। বাস্তুচ্যুতদের লক্ষ্য করে একের পর এক হামলা মানবিক বিপর্যয়কে ভয়াবহতর করে তুলছে। শিশু, নারী, বৃদ্ধ— কেউ রেহাই পাচ্ছে না।
জাতিসংঘসহ বিশ্বের নানা মানবাধিকার সংগঠন অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধ এবং যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানালেও বাস্তবে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। বরং প্রতিদিনের খবরেই যোগ হচ্ছে নতুন করে মৃত্যুর সংখ্যা, ধ্বংসের বর্ণনা ও মানবতার আর্তনাদ।
গাজার মতো সংকটাপন্ন এক ভূখণ্ডে যেখানে মানুষ প্রতিদিন বেঁচে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত, সেখানে ত্রাণের আশায় এসে প্রাণ হারানো যেন মানবসভ্যতার এক করুণ ব্যর্থতার দলিল হয়ে উঠছে। এবং বিশ্বের নীরবতা সেই ব্যর্থতাকে আরও গভীরতর করছে।
একটি বাংলাদেশ অনলাইন