প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে আবারও রক্তাক্ত হয়ে উঠেছে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার পরও সেই সমঝোতার শর্ত উপেক্ষা করে লেবাননে ব্যাপক সামরিক অভিযান চালিয়েছে ইসরাইল। বুধবার ভোর থেকে শুরু হওয়া এই হামলায় অন্তত ১০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও বহু মানুষ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, হামলাগুলো ছিল পরিকল্পিত ও লক্ষ্যভিত্তিক, যা লেবাননের সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল যে, আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে লেবাননসহ অন্যান্য ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধ রাখতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র সেই অবস্থান মেনে নেওয়ার ইঙ্গিত দিলেও ইসরাইল শুরু থেকেই জানিয়েছিল যে, তারা লেবানন প্রসঙ্গে কোনো বাধ্যবাধকতা স্বীকার করবে না। এই অবস্থানেরই প্রতিফলন দেখা গেছে সর্বশেষ হামলায়, যা যুদ্ধবিরতির আঞ্চলিক প্রভাবকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলের সিডন শহরের একটি ক্যাফেতে ইসরাইলি বিমান হামলায় অন্তত আটজন নিহত হন। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ২৮ জন, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, সকালে ব্যস্ত সময়ে ক্যাফেটিতে হঠাৎ করে বিস্ফোরণ ঘটে এবং মুহূর্তেই এলাকা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। উদ্ধারকর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যান, কিন্তু অনেকের জীবন আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে, স্থানীয় গণমাধ্যম আল-মায়াদিনের খবরে বলা হয়েছে, রাস এল-আইন এলাকায় একটি চলন্ত গাড়িকে লক্ষ্য করে চালানো হামলায় আরও দুজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ওয়াদি বারঘাজ এলাকাতেও যুদ্ধবিমান থেকে বোমা হামলার খবর পাওয়া গেছে, যেখানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। পুরো দক্ষিণ লেবাননজুড়ে এই হামলা নতুন করে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
লেবাননের ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ইসরাইলি বাহিনীর হামলা এখনও থামেনি এবং বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে আক্রমণ অব্যাহত রয়েছে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর আরবি ভাষার মুখপাত্র আভিচাই আদরাই দক্ষিণ লেবাননের টাইর শহরের বাসিন্দাদের উদ্দেশে একটি সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি সম্ভাব্য হামলার আগে স্থানীয়দের জাহরানি নদীর উত্তরে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এই সতর্কবার্তা সাধারণ মানুষের মধ্যে আরও আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে, কারণ অনেকেই এটিকে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের পূর্বাভাস হিসেবে দেখছেন।
চলমান পরিস্থিতিতে লেবাননের ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট ইউনিট দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে বাস্তুচ্যুত মানুষদের ফিরে না যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং যেকোনো সময় নতুন করে হামলা শুরু হতে পারে। ফলে যারা ইতোমধ্যে ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন, তাদের আপাতত সেখানেই অবস্থান করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
লেবাননের কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি হামলায় এখন পর্যন্ত এক হাজার পাঁচশোর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং প্রায় ১২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এই পরিসংখ্যান শুধু একটি চলমান সংঘাতের ভয়াবহতাই তুলে ধরে না, বরং মানবিক সংকটের গভীরতাও স্পষ্ট করে। হাজার হাজার পরিবার তাদের ঘরবাড়ি হারিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসরাইলের এই সামরিক অভিযান কেবল তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ হতে পারে। ইসরাইলি সেনাবাহিনী ইতোমধ্যে দক্ষিণ লেবাননে স্থল অভিযান শুরু করেছে এবং তারা ‘বাফার জোন’ তৈরির লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। এই বাফার জোন মূলত একটি নিরাপত্তা বলয়, যা ইসরাইলের উত্তর সীমান্তকে সম্ভাব্য হামলা থেকে রক্ষা করবে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অর্থ হচ্ছে আরও বিস্তৃত এলাকা দখল এবং সেখানে বসবাসকারী মানুষের ব্যাপক স্থানচ্যুতি।
আন্তর্জাতিক মহল এই পরিস্থিতি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। যুদ্ধবিরতি চুক্তির পরও এমন হামলা আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এই ধরনের ঘটনায় দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা বলছে, বেসামরিক এলাকায় হামলা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন এবং এর জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে তারা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য জরুরি মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। যারা প্রতিদিনের জীবনে যুদ্ধের ভয়াবহতা বয়ে বেড়াচ্ছেন, তাদের জন্য প্রতিটি দিনই এক নতুন অনিশ্চয়তা। পরিবার হারানোর শোক, ঘরবাড়ি হারানোর বেদনা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অজানা ভয়—সব মিলিয়ে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল এখন এক গভীর মানবিক সংকটের মুখোমুখি।
যুদ্ধবিরতির শর্ত উপেক্ষা করে চালানো এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে। এখন প্রশ্ন উঠছে, এই পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে থামবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কতটা কার্যকরভাবে এই সংকট মোকাবিলা করতে পারবে। তবে আপাতত লেবাননের আকাশে যে ধোঁয়া উড়ছে, তা যেন শুধু বোমার বিস্ফোরণের নয়, বরং শান্তির সম্ভাবনাও ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাওয়ার প্রতীক।