প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশে জ্বালানি আমদানির জন্য পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার মজুত রয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ওঠানামা করলেও আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও নীতি সহায়তা অব্যাহত রয়েছে। এ অবস্থায় অযথা আতঙ্ক না ছড়িয়ে স্বাভাবিকভাবে জ্বালানি কেনাবেচা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে দেশে জ্বালানি আমদানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই মাসে প্রায় ৪ লাখ ১৭ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল আমদানি করা হয়েছে, যার জন্য ব্যয় হয়েছে ২৩৯.১৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। পাশাপাশি পেট্রোলিয়ামজাত অন্যান্য পণ্য এবং এলএনজি মিলিয়ে মোট জ্বালানি আমদানি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৪৬ হাজার মেট্রিক টনে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, এটি সাম্প্রতিক মাসগুলোর মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ আমদানি প্রবাহ।
তবে বাস্তবে বাজারে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে সকাল থেকেই দীর্ঘ সারি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পাম্প খোলার আগেই যানবাহনের লাইন তৈরি হচ্ছে এবং খোলার অল্প সময়ের মধ্যেই জ্বালানি শেষ হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। পাম্প মালিক ও কর্মীরা বলছেন, দিন দিন এই চাপ বাড়ছে, ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এই পরিস্থিতি শুধু সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে নয়, শিল্প ও উৎপাদন খাতেও প্রভাব ফেলছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে পরিবহন ও রপ্তানিনির্ভর শিল্পগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই ধরনের পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে এবং রপ্তানি খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক অস্থিরতার কারণে রপ্তানি খাতে চাপ তৈরি হয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে রপ্তানি আয় পুনরুদ্ধার আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বৈদেশিক মুদ্রার সংকট নেই। বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে পর্যাপ্ত ডলার রয়েছে এবং আমদানি কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি বিভাগের পরিচালক মো. শাহরিয়ার সিদ্দিকী জানান, অনেক সময় গুজব বা আতঙ্কের কারণে হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যায়, যা সাময়িক সংকট তৈরি করে। তবে প্রকৃত অর্থে জ্বালানি আমদানিতে কোনো বাধা নেই এবং বিষয়টি নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য এখন প্রায় ৩.৯ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি রয়েছে। পাশাপাশি নেট ওপেন পজিশনও ৬০০ থেকে ৭০০ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে স্থিতিশীল রয়েছে। এই আর্থিক অবস্থান জ্বালানি আমদানির জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। তবে দেশে পর্যাপ্ত রিজার্ভ এবং নীতি সহায়তা থাকলে দীর্ঘমেয়াদে সংকটের ঝুঁকি কম থাকবে। তারা মনে করছেন, বাজারে গুজব ও আতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক, জ্বালানি মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো একসঙ্গে কাজ করছে বলে জানা গেছে। লক্ষ্য হলো বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সাধারণ মানুষের জন্য জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে আবারও সবাইকে গুজবে কান না দিয়ে স্বাভাবিকভাবে ক্রয়-বিক্রয় চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।