প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামে এবং হামের উপসর্গ নিয়ে আরও সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একই সময়ে নতুন করে ৮২ জনের শরীরে হামের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে এবং শত শত শিশু উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যুবরণ করা সাত শিশুর মধ্যে দুইজনের মৃত্যু সরাসরি হামের কারণে হয়েছে, যা পরীক্ষায় নিশ্চিত করা হয়েছে। বাকি পাঁচজন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে বলে জানানো হয়েছে, যদিও তাদের ক্ষেত্রে চূড়ান্তভাবে রোগ শনাক্তের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়নি। এই মৃত্যুগুলোর মধ্যে অধিকাংশই ঢাকা বিভাগের, যা দেশের সবচেয়ে জনবহুল অঞ্চলে সংক্রমণের তীব্রতা আরও বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে, আর উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া পাঁচ শিশুর মধ্যে চারজনও একই বিভাগের। অপর একজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে রাজশাহী বিভাগে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে বেশি মৃত্যু ও সংক্রমণ দেখা গেলে তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৮২ জনের শরীরে হামের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৭৬ জনই ঢাকা বিভাগের, যা রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় রোগটির দ্রুত বিস্তারের ইঙ্গিত দেয়। রাজশাহী বিভাগে চারজন এবং চট্টগ্রামে দুইজন রোগী শনাক্ত হয়েছে। অন্য কোনো বিভাগে নতুন করে রোগী শনাক্ত হয়নি বলে জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, একই সময়ে সারা দেশে ১ হাজার ৩৭১ জন শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। এর মধ্যে শুধু ঢাকা বিভাগেই ৬১৫ জন শিশু উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। এছাড়া ৭২৯ জন শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, যার মধ্যে আবারও ঢাকা বিভাগেই ২৭৪ জন শিশু রয়েছে। সবচেয়ে কম ভর্তি রোগী রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগে হলেও সার্বিকভাবে সব বিভাগেই কমবেশি সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে।
চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর চাপও ক্রমশ বাড়ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া ৭১৩ জন শিশু হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ৩০৫ জন, রাজশাহী বিভাগে ১২ জন এবং চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগে ১০৩ জন করে রোগী হাসপাতাল ছেড়েছে। তবে নতুন রোগী ভর্তির হার ছাড় পাওয়া রোগীর তুলনায় বেশি হওয়ায় হাসপাতালগুলোতে চাপ অব্যাহত রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে হামে মোট ৩০ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে আরও ১৫৬ শিশুর, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে তুলছে। এই সময়ের মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১৭ হাজার ২৪ জন রোগী চিকিৎসা নিতে এসেছে, যাদের মধ্যে ১০ হাজার ৯৫৪ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ২ হাজার ৭২১ জনের হামের সংক্রমণ নিশ্চিত করা হয়েছে।
চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের মতো সংক্রামক রোগ সাধারণত টিকাদানের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। কিন্তু টিকাদান কাভারেজ কমে যাওয়া, সময়মতো টিকা না পাওয়া এবং জনসচেতনতার ঘাটতির কারণে এই ধরনের রোগ আবারও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বেশি হওয়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম জোরদার না করা হলে এবং সংক্রমিত এলাকা চিহ্নিত করে বিশেষ ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাথমিক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে হাসপাতালগুলোতে শিশু রোগীদের চাপ বাড়ায় চিকিৎসা ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত শয্যা ও চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে দেশে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তা জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।