প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে নতুন কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে। সম্ভাব্য শান্তি আলোচনা শুরুর আগেই সংঘর্ষ ও সামরিক উত্তেজনা কমানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে লেবানন সরকার। দেশটির সংস্কৃতিমন্ত্রী ঘাসান সালামে জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরাসরি শান্তি আলোচনা নয়, বরং প্রথম ধাপে সামরিক সংঘাত কমানোই মূল লক্ষ্য।
কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ঘাসান সালামে বলেন, এটি কোনো পূর্ণাঙ্গ শান্তি আলোচনা নয়, বরং রাষ্ট্রদূত পর্যায়ের একটি প্রস্তুতিমূলক বৈঠক। এই বৈঠকের উদ্দেশ্য হলো দুই পক্ষের মধ্যে সামরিক তৎপরতা সাময়িকভাবে হলেও বন্ধ করার পথ খোঁজা। তিনি স্পষ্ট করে জানান, পুরোপুরি যুদ্ধবিরতি না হলেও অন্তত গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলার মতো বড় ধরনের সহিংসতা বন্ধ করার চেষ্টা করা হবে।
লেবাননের এই অবস্থান এমন এক সময়ে এসেছে যখন ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সীমান্ত অঞ্চলে উত্তেজনা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা এবং প্রতিরোধমূলক সামরিক পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এর ফলে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে সাধারণ মানুষের জীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
ঘাসান সালামে জানান, এই প্রাথমিক কূটনৈতিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে আগামীকাল ওয়াশিংটনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সেখানে রাষ্ট্রদূত পর্যায়ে আলোচনা হবে এবং সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির একটি কাঠামো নিয়ে মতবিনিময় করা হবে। তিনি বলেন, এই আলোচনাকে কোনো চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে দেখা ঠিক হবে না, বরং এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার শুরু মাত্র।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরও এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মঙ্গলবার সেখানে ইসরায়েল ও লেবাননের রাষ্ট্রদূতদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে উত্তেজনা প্রশমনের সম্ভাব্য পথ নিয়ে আলোচনা হবে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল মনে করছে, এই বৈঠক ভবিষ্যতের বড় কোনো শান্তি প্রক্রিয়ার ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
ইসরায়েলের পক্ষ থেকে হিজবুল্লাহকে দ্রুত নিরস্ত্র করার যে দাবি উঠেছে, সে বিষয়ে লেবাননের অবস্থান তুলনামূলকভাবে সতর্ক। ঘাসান সালামে বলেন, এটি কোনো স্বল্পমেয়াদি প্রক্রিয়া নয় এবং কয়েক দিন বা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এমন জটিল রাজনৈতিক ও সামরিক বিষয় সমাধান সম্ভব নয়। তার মতে, হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যা সম্পন্ন হতে বহু বছর লেগে যেতে পারে।
এই মন্তব্যের মাধ্যমে লেবানন সরকার মূলত বাস্তবতার ভিত্তিতে একটি ধীর ও ধাপে ধাপে সমাধানের দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ হিজবুল্লাহ শুধু একটি সামরিক গোষ্ঠী নয়, বরং লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত একটি শক্তি।
অন্যদিকে বৈরুতসহ লেবাননের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রতিক সহিংসতার প্রভাব কিছুটা কমেছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন মন্ত্রী সালামে। তিনি জানান, এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হয়নি, তবে কিছু প্রতিশ্রুতি এবং উত্তেজনা কমানোর অঙ্গীকার পাওয়া গেছে। এর ফলে রাজধানী বৈরুতে আপাতত তুলনামূলক স্বস্তির পরিবেশ বিরাজ করছে।
তবে এই স্বস্তি কতদিন স্থায়ী হবে, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। কারণ সীমান্ত পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, যদি এই প্রাথমিক কূটনৈতিক উদ্যোগ সফল হয়, তাহলে তা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে স্থিতিশীলতার একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, লেবানন বর্তমানে এক কঠিন কূটনৈতিক অবস্থানে রয়েছে। একদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ, অন্যদিকে আঞ্চলিক সামরিক উত্তেজনা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ এড়িয়ে চলা এবং একই সঙ্গে দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি জটিল সমীকরণ।
এই পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনভিত্তিক আলোচনাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল আশা করছে, এই বৈঠকের মাধ্যমে অন্তত একটি প্রাথমিক যুদ্ধবিরতির রূপরেখা তৈরি হতে পারে, যা পরবর্তী সময়ে পূর্ণাঙ্গ শান্তি আলোচনার পথ খুলে দিতে পারে।
সব মিলিয়ে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান উত্তেজনা নতুন এক কূটনৈতিক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। সংঘর্ষ কমানোর প্রাথমিক উদ্যোগ সফল হলে তা শুধু এই দুই দেশের জন্যই নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হবে।