প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন আসনে রাজনৈতিক উত্তাপ ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় নওগাঁ জেলার বরেন্দ্র অঞ্চলখ্যাত আত্রাই-রাণীনগর নিয়ে গঠিত নওগাঁ-৬ আসনেও নির্বাচনী মাঠে প্রস্তুতি পর্ব এখন তুঙ্গে। ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমার্ধে জাতীয় নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় ধরে প্রার্থীরা একের পর এক মাঠে নামতে শুরু করেছেন। দলীয় মনোনয়ন নিশ্চিত করতে যেমন চলছে তৎপরতা, তেমনি ভোটারদের মন জয় করতেও চলছে নানা কার্যক্রম।
নওগাঁ-৬ আসনটি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হলেও সময়ের আবর্তে এখানে পালাবদল ঘটেছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে প্রায় তিন দশকের পর এই আসন থেকে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে এমপি নির্বাচিত হন ইসরাফিল আলম। তার পরবর্তী সময়ে আবার রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলাতে শুরু করে। বর্তমানে আসনটি ঘিরে জামায়াত, বিএনপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও নবাগত এনসিপি নেতাদের মধ্যেও চলছে ভিন্ন মাত্রার প্রতিযোগিতা।
ইতোমধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে এই আসনের জন্য একক প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমেছেন আত্রাই উপজেলার পাঁচুপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য খবিরুল ইসলাম। দলীয়ভাবে প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ার পর থেকেই তিনি নিয়মিত নির্বাচনী এলাকায় গণসংযোগ করছেন। কখনও মোটরসাইকেল শোডাউন, কখনও এলাকাভিত্তিক বৈঠক করে ভোটারদের কাছে নিজের অবস্থান তুলে ধরছেন।
অন্যদিকে বিএনপির পক্ষে মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতারা কেউ কারও চেয়ে কম যান না। সাবেক প্রতিমন্ত্রী আলমগীর কবির, জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আনোয়ার হোসেন বুলু, জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আমিনুল ইসলাম বেলাল, আত্রাই উপজেলা বিএনপির সভাপতি শেখ রেজাউল ইসলাম রেজু এবং রাণীনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি এছাহক আলীসহ একাধিক নেতা ভিন্ন ভিন্নভাবে মাঠে সক্রিয় আছেন। দলীয় মনোনয়ন পেতে তারা একদিকে দলীয় কর্মীদের সক্রিয় রাখতে নানা কৌশল গ্রহণ করছেন, অন্যদিকে অংশ নিচ্ছেন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে, দিচ্ছেন শুভেচ্ছাবার্তা, ব্যানার-পোস্টারে হাজির হচ্ছেন জনদৃষ্টিতে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও বসে নেই। কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব ইঞ্জিনিয়ার আশরাফুল আলমের নেতৃত্বে রাণীনগরের চকাদিন মাদরাসায় এক মতবিনিময় সভার মাধ্যমে দলটি প্রার্থী চূড়ান্তের প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন করেছে। যদিও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নাম ঘোষণা করা হয়নি। মাঠপর্যায়ে জরিপ ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে প্রার্থী নির্ধারণে তারা সময় নিচ্ছে।
তবে এখানেই শেষ নয়। রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সংযোজন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। জুলাই ২০২৪ সালের আন্দোলনের পর দৃশ্যপটে আসা এ দলের নেতারা সম্প্রতি নওগাঁ সফরের অংশ হিসেবে রাণীনগরের কুজাইল বাজারে এক পথসভায় তাদের নির্বাচনী উপস্থিতির ইঙ্গিত দিয়েছেন। দলের পক্ষে সরাসরি প্রার্থী না নামলেও তারা আসনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহী, এমনটিই মনে করছেন স্থানীয় বিশ্লেষকরা।
এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৫৫ হাজার ৭০৬ জন। দুই উপজেলার ১৬টি ইউনিয়নজুড়ে ভোটারদের পছন্দ ও মনের দিক পরিবর্তনের ধরনকে গুরুত্ব দিয়েই সক্রিয় হয়েছেন প্রার্থীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তারা সক্রিয়ভাবে নিজেদের তুলে ধরছেন। ঈদ ও ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে শুভেচ্ছাবার্তা দিয়ে মনোনয়ন নিশ্চিতকরণ এবং পরিচিতি বাড়াতে চালাচ্ছেন প্রচারণা।
আত্রাই-রাণীনগরের একসময় যে পরিচয় ছিল ‘আতঙ্কিত জনপদ’, বর্তমানে সেটি ধীরে ধীরে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে রূপ নিয়েছে। এখানকার সাধারণ মানুষ চায় স্থিতিশীল উন্নয়ন, নিরাপত্তা এবং দুর্নীতিমুক্ত একটি প্রশাসনিক কাঠামো। সেই আকাঙ্ক্ষাকেই পুঁজি করে প্রার্থীরা দিচ্ছেন প্রতিশ্রুতি।
জামায়াতের প্রার্থী খবিরুল ইসলাম বলেন, “আমরা একটি সুশৃঙ্খল ইসলামি দল। যদি জনগণ আমাকে নির্বাচিত করে, তাহলে এই এলাকায় সন্ত্রাস, দখলবাজি, চাঁদাবাজি নির্মূলে যথাযথ পদক্ষেপ নেব।”
বিএনপির নেতা আমিনুল ইসলাম বেলাল বলেন, “ফ্যাসিস্ট সরকারের বিদায়ের পর দেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের লড়াইয়ে আমরা আছি। আমি একজন যোগ্য ও সৎ প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পাওয়ার প্রত্যাশায় মাঠে কাজ করছি। নির্বাচিত হলে জনগণের নিরাপত্তা ও উন্নয়নে কাজ করব।”
এই চিত্র বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায়, নওগাঁ-৬ আসনে নির্বাচন শুধুই ভোটের লড়াই নয়—এটি আদর্শ, ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশার এক জটিল সন্নিবেশ। ভোটারদের মুড বদলাতে পারে শেষ মুহূর্তের ঘটনাপ্রবাহ বা দলীয় সিদ্ধান্ত। তবে ইতোমধ্যে প্রার্থীদের সরব অবস্থান প্রমাণ করে দিয়েছে—এই আসনে লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি, উত্তেজনায় পরিপূর্ণ।
একটি বাংলাদেশ অনলাইন