রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে প্রাণ গেল মৌলভীবাজারের মুহিবুরের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১৪ বার
রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধ করে প্রাণ হারালেন মৌলভীবাজারের মুহিবুর

প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্নকে কেন্দ্র করে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করেছিলেন মৌলভীবাজারের তরুণ মুহিবুর রহমান (২৩)। কিন্তু সেই স্বপ্নই শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় এক ভয়াবহ পরিণতিতে। দালালের প্রলোভনে পড়ে তিনি রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেনের চলমান যুদ্ধে অংশ নেন এবং শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় প্রাণ হারান বলে জানা গেছে।

পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় এক সপ্তাহ আগে তার মৃত্যু হলেও বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে সোমবার (২০ এপ্রিল)। এতে পরিবার, স্বজন এবং স্থানীয় এলাকায় নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া।

মুহিবুর রহমান মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আমতৈল ইউনিয়নের সম্পদপুর গ্রামের বাসিন্দা এবং মসুদ মিয়ার ছেলে। তিনি ছিলেন একজন তরুণ শিক্ষার্থী, যিনি ভবিষ্যৎ গড়ার আশায় বিদেশে পড়াশোনার স্বপ্ন লালন করতেন। পরিবারের সদস্যরা জানান, তিনি এইচএসসি ২০১৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং পড়াশোনার পাশাপাশি বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

পরিবারের বর্ণনা অনুযায়ী, মুহিবুর উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রথমে মেক্সিকোতে যান। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর কোনো এক অনিশ্চিত কারণে তার ভিসা বাতিল হয়ে যায়। এতে তিনি চরম মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যান। বিদেশে অবস্থান, আর্থিক সংকট এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণে তিনি দিশেহারা হয়ে পড়েন।

এই সময়েই তিনি একদল দালালের সংস্পর্শে আসেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। দালালরা তাকে প্রলোভন দেখিয়ে জানায় যে, রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধ করলে উচ্চ পরিমাণ বেতন পাওয়া যাবে এবং যুদ্ধ শেষে রাশিয়ার নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ থাকবে। এমন আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতির ফাঁদে পড়ে মুহিবুর সিদ্ধান্ত নেন রাশিয়ায় যাওয়ার।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তখন তিনি বুঝতে পারেননি যে এটি একটি ভয়াবহ প্রতারণার জাল। উচ্চশিক্ষার জন্য যে তরুণ দেশ ছেড়েছিলেন, সেই তরুণের হাতেই পরবর্তীতে তুলে দেওয়া হয় যুদ্ধাস্ত্র।

রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাকে সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় বলে জানা যায়। প্রশিক্ষণ শেষে তাকে সরাসরি ইউক্রেনের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে সম্মুখ সারিতে পাঠানো হয়। পরিবার জানায়, শুরুতে তার সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও ধীরে ধীরে সেই যোগাযোগ কমে আসে এবং একপর্যায়ে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থানকালীন সময়ে তিনি বিভিন্ন সামরিক ইউনিটের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে জানা গেছে। তবে শেষ পর্যন্ত এক ভয়াবহ ড্রোন হামলায় তার জীবনাবসান ঘটে। জানা যায়, মুহিবুর একটি বাংকারের ভেতরে অবস্থান করছিলেন, তখন ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলায় ওই বাংকারটি ধ্বংস হয়ে যায় এবং ঘটনাস্থলেই তিনি প্রাণ হারান।

মৃত্যুর খবর প্রথমে পরিবার নিশ্চিতভাবে জানতে পারেনি। পরে রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন ব্যক্তির মাধ্যমে খাবার সরবরাহে যুক্ত একজন ব্যক্তি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি জানান। এই খবর পাওয়ার পর মুহিবুরের পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া, যা মুহূর্তেই পুরো গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

মুহিবুরের বাবা মসুদ মিয়া বলেন, তার ছেলে ছিল শান্ত স্বভাবের এবং পড়াশোনায় আগ্রহী। বিদেশে গিয়ে ভালো কিছু করবে—এমন স্বপ্নই তারা দেখেছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন যে এভাবে যুদ্ধের বিভীষিকায় শেষ হয়ে যাবে, তা তারা কখনো ভাবেননি।

স্থানীয়রা জানান, মুহিবুর ছিলেন একজন ভদ্র ও স্বপ্নবাজ তরুণ। গ্রামের অনেকেই তাকে নিয়ে আশা দেখতেন। কিন্তু বিদেশে গিয়ে এমন একটি পরিস্থিতিতে পড়বেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ হারাবেন—এটা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের ঘটনা বৈশ্বিক শ্রমবাজার ও অভিবাসন ব্যবস্থার দুর্বল দিকগুলোকে সামনে নিয়ে আসে। বিশেষ করে কিছু দালালচক্র তরুণদের বিভ্রান্ত করে যুদ্ধক্ষেত্র বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পাঠাচ্ছে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। উচ্চ আয়ের প্রলোভনে অনেকেই বাস্তব পরিস্থিতি না জেনে বিপদের মুখে পড়ছেন।

এদিকে মুহিবুর রহমানের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। স্বজন ও প্রতিবেশীরা তার পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন। অনেকেই বলছেন, একজন সম্ভাবনাময় তরুণের এমন মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের জন্যই এক গভীর বেদনার ঘটনা।

বর্তমানে পরিবারের পক্ষ থেকে তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক জটিলতার কারণে বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত রয়ে গেছে।

মুহিবুরের মৃত্যু আবারও প্রশ্ন তুলেছে বিদেশে কর্মসংস্থান ও শিক্ষার নামে গড়ে ওঠা প্রতারণা চক্র নিয়ে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তরুণদের সঠিক তথ্য, নিরাপদ অভিবাসন ব্যবস্থা এবং সরকারি পর্যায়ের নজরদারি আরও জোরদার করা না হলে এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা ভবিষ্যতেও ঘটতে পারে।

স্বপ্ন নিয়ে দেশ ছাড়লেও মুহিবুর রহমানের জীবন শেষ হলো যুদ্ধের বিভীষিকায়—এই বাস্তবতা এখন তার গ্রামের প্রতিটি মানুষের মনে গভীর শোক ও হতাশার ছাপ রেখে গেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত