প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বজুড়ে অভিবাসন পথ এখনো প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে অভিবাসন চলাকালে প্রায় ৭ হাজার ৯০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং আরও প্রায় ১ হাজার ৫০০ জন নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের আর ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংশ্লিষ্ট সংস্থা।
জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা জানায়, এই নিখোঁজদের অনেকেই সম্ভাব্যভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতিবেদনটি আন্তর্জাতিক অভিবাসন পরিস্থিতির ভয়াবহ বাস্তবতা আবারও সামনে এনেছে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এর তথ্যের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি জানায়, অভিবাসন পথগুলোতে বিপজ্জনক যাত্রা, মানবপাচার, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং নৌপথে দুর্ঘটনার কারণে প্রতি বছরই হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন।
আইওএম-এর ‘মিসিং মাইগ্র্যান্টস প্রজেক্ট’ অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত অভিবাসনের সময় ৮০ হাজারেরও বেশি মৃত্যু ও নিখোঁজের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। একই সময়ে আনুমানিক ৩ লাখ ৪০ হাজার পরিবার সরাসরি এই ট্র্যাজেডির শিকার হয়েছে, যা বৈশ্বিক মানবিক সংকটের একটি বড় দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, এই পরিসংখ্যান প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির সর্বনিম্ন অনুমানমাত্র। বাস্তবে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ অনেক ঘটনা নথিভুক্ত হয় না বা দূরবর্তী অঞ্চলে সংঘটিত হওয়ায় তথ্য সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ অভিবাসন পথের অভাব, সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল, দারিদ্র্য এবং উন্নত জীবনের আশায় ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রাই এই মৃত্যুর প্রধান কারণ। বিশেষ করে ভূমধ্যসাগরীয় রুট, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার কিছু সীমান্তবর্তী এলাকায় অভিবাসন দুর্ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে থাকে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, অভিবাসীদের এই মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি দীর্ঘস্থায়ী বৈশ্বিক সংকটের অংশ। তাদের মতে, অনেক দেশেই নিরাপদ অভিবাসন ব্যবস্থা না থাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে দালাল চক্র ও বিপজ্জনক পথ বেছে নেয়।
আইওএম আরও জানিয়েছে, এই সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করা জরুরি। বিশেষ করে অভিবাসন রুটগুলোকে নিরাপদ করা, মানবপাচার রোধ করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিবাসীদের মৃত্যু শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন এবং একটি ভবিষ্যৎ। এই বাস্তবতা বৈশ্বিক নীতিনির্ধারকদের জন্য গভীর চিন্তার বিষয় হয়ে উঠেছে।
বিশ্বের বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ইতোমধ্যে এই পরিস্থিতিকে “নীরব মানবিক বিপর্যয়” হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। তারা বলছে, অভিবাসন ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন না আনলে এই মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অভিবাসন এখন বৈশ্বিক অর্থনীতি ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। কাজের সুযোগ, নিরাপত্তা ও উন্নত জীবনের আশায় মানুষ সীমান্ত পেরোতে চায়, কিন্তু নিরাপদ পথ না থাকায় অনেকেই চরম ঝুঁকির মুখে পড়ছেন।
আইওএম-এর এই নতুন তথ্য আবারও বিশ্ব নেতাদের সামনে প্রশ্ন তুলেছে—কতদিন পর্যন্ত এই প্রাণহানি চলবে এবং কীভাবে একটি নিরাপদ বৈশ্বিক অভিবাসন কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব।
সব মিলিয়ে ২০২৫ সালের এই পরিসংখ্যান বিশ্বজুড়ে অভিবাসন সংকটের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে, যা মানবিক ও নীতিগত উভয় দিক থেকেই দ্রুত সমাধানের দাবি রাখে।