প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় পর আবারও রোমানিয়া জাতীয় ফুটবল দলের দায়িত্বে ফিরলেন দেশটির কিংবদন্তি ফুটবলার Gheorghe Hagi। একসময় যিনি মাঠে জাদুকরী ফুটবল দিয়ে বিশ্বকে মুগ্ধ করেছিলেন, এবার তিনি সেই দলের হাল ধরেছেন কোচ হিসেবে। প্রায় ২৫ বছর পর দ্বিতীয়বারের মতো জাতীয় দলের প্রধান কোচের দায়িত্ব নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছেন তিনি।
রোমানিয়া ফুটবল ফেডারেশনের ঘোষণা অনুযায়ী, সম্প্রতি প্রয়াত কোচ Mircea Lucescu–এর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন হ্যাজি। লুচেস্কুর মৃত্যু দেশের ফুটবল অঙ্গনে শোকের ছায়া ফেলেছিল। সেই শূন্যতা পূরণে এমন একজন কিংবদন্তির প্রত্যাবর্তন অনেকের কাছেই আশার আলো হয়ে এসেছে।
৬১ বছর বয়সী হ্যাজিকে রোমানিয়ার সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁর খেলার সময়কার সৃজনশীলতা, দূরপাল্লার শট এবং মাঠে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা তাঁকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ১৯৯৪ সালের FIFA World Cup 1994-এ তাঁর নেতৃত্বে রোমানিয়া কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত উঠেছিল, যা দেশটির ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা সাফল্য।
ক্লাব ক্যারিয়ারে হ্যাজি ইউরোপের শীর্ষ দুই ক্লাব FC Barcelona এবং Real Madrid CF-এর হয়ে খেলেছেন। তাঁর খেলার ধরণ ও দক্ষতা তাঁকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক বিশেষ মর্যাদা এনে দেয়। তাই কোচ হিসেবে তাঁর প্রত্যাবর্তন শুধু একটি নিয়োগ নয়, বরং একটি আবেগঘন অধ্যায়ের সূচনা।
হ্যাজির কোচিং ক্যারিয়ারের শুরুটা অবশ্য খুব দীর্ঘস্থায়ী ছিল না। ২০০১ সালে প্রথমবার রোমানিয়া দলের দায়িত্ব নিয়ে মাত্র তিন মাসের মধ্যেই বিদায় নিতে হয় তাঁকে। ২০০২ বিশ্বকাপের প্লে-অফে দলকে তুলতে ব্যর্থ হওয়ায় তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তবে এরপর তিনি ক্লাব পর্যায়ে নিজেকে গড়ে তোলেন এবং তুরস্কের গ্যালাতাসারায় ও রোমানিয়ার স্টিয়া বুখারেস্টের মতো ক্লাবে কাজ করেন।
নতুন দায়িত্ব পাওয়ার পর হ্যাজি নিজেও আবেগাপ্লুত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি বলেন, খেলোয়াড় হিসেবে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার পর আবার কোচ হিসেবে সেই সুযোগ পাওয়া তাঁর জন্য বড় সম্মানের। একই সঙ্গে এটি একটি বড় দায়িত্ব বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস, দলকে আবারও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্তিশালী অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব।
বর্তমানে রোমানিয়া জাতীয় দল একটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে বড় কোনো আন্তর্জাতিক সাফল্য না পাওয়ায় দলটির পারফরম্যান্স নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। রোমানিয়া সর্বশেষ বিশ্বকাপে খেলেছিল ১৯৯৮ সালে। এরপর থেকে তারা বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিতে পারেনি, যা দেশটির ফুটবলপ্রেমীদের জন্য হতাশাজনক।
২০২৪ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে রোমানিয়া শেষ ষোলোতে উঠলেও শেষ পর্যন্ত Netherlands national football team-এর কাছে হেরে বিদায় নিতে হয়। এই পারফরম্যান্স কিছুটা আশার সঞ্চার করলেও ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি দলটি।
নতুন কোচ হিসেবে হ্যাজির সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো দলকে পুনর্গঠন করা এবং তরুণ খেলোয়াড়দের নিয়ে একটি প্রতিযোগিতামূলক দল তৈরি করা। ইতোমধ্যে জুন মাসে জর্জিয়া ও ওয়েলসের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ দিয়ে তাঁর নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। এই ম্যাচগুলোই হবে তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রথম পরীক্ষা।
আগামী সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া নেশন্স লিগেও রোমানিয়াকে কঠিন প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে হবে। সুইডেন, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা এবং পোল্যান্ডের মতো দলগুলোর বিপক্ষে খেলতে হবে তাদের। ফলে শুরু থেকেই হ্যাজিকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
রোমানিয়া ফুটবল ফেডারেশন জানিয়েছে, ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত হ্যাজির সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থেকেই বোঝা যায়, তাঁকে কেন্দ্র করেই দলকে নতুনভাবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে কর্তৃপক্ষ। ফেডারেশনের সভাপতি রাজভান বুরলিয়ানু জানিয়েছেন, হ্যাজিকে ফিরিয়ে আনতে তারা বহুদিন ধরে চেষ্টা করছিলেন।
হ্যাজির লক্ষ্যও স্পষ্ট—রোমানিয়াকে আবার বিশ্ব ফুটবলের অভিজাত পর্যায়ে ফিরিয়ে আনা। তাঁর মতে, সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর পরিশ্রম এবং দলগত ঐক্যের মাধ্যমে এটি সম্ভব। তিনি বিশ্বাস করেন, বর্তমান প্রজন্মের খেলোয়াড়দের মধ্যে যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে, যা কাজে লাগানো গেলে দলটি আবারও সাফল্যের পথে ফিরতে পারবে।
ফুটবল বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হ্যাজির অভিজ্ঞতা এবং ব্যক্তিত্ব দলকে মানসিকভাবে উজ্জীবিত করতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। একজন কিংবদন্তি খেলোয়াড় হিসেবে তাঁর উপস্থিতি খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে এবং মাঠে তাদের পারফরম্যান্সেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সব মিলিয়ে, রোমানিয়া ফুটবলে এটি একটি নতুন শুরুর ইঙ্গিত। দীর্ঘদিনের হতাশা কাটিয়ে নতুন স্বপ্ন দেখার সুযোগ এনে দিয়েছেন হ্যাজি। এখন দেখার বিষয়, কোচ হিসেবে তিনি কতটা সফলভাবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারেন।