প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বজুড়ে বায়ুদূষণের ভয়াবহতা দিন দিন আরও উদ্বেগজনক আকার ধারণ করছে। জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং নগরজীবনের মানের ওপর এর প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণ সংস্থা আইকিউএয়ারের (IQAir) সর্বশেষ সূচকে দেখা গেছে, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে নেপালের রাজধানী Kathmandu। এরপর রয়েছে ভারতের রাজধানী Delhi এবং তৃতীয় অবস্থানে আছে পাকিস্তানের Lahore। একই তালিকায় বাংলাদেশের রাজধানী Dhaka রয়েছে নবম স্থানে।
আইকিউএয়ারের তথ্য অনুযায়ী, কাঠমাণ্ডুর বায়ুদূষণ স্কোর ছিল ২৪০, যা ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচিত। এই মাত্রার দূষণ দীর্ঘ সময় ধরে শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করলে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া, হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়া এবং শিশু ও বয়স্কদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। শহরটির আকাশে ধোঁয়া ও ধুলার ঘনত্ব এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অনেক এলাকায় দৃশ্যমানতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা দিল্লির বায়ুর মানও উদ্বেগজনক। শহরটির দূষণ স্কোর ছিল ১৮৬, যা ‘অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ে পড়ে। বিশেষ করে শীতকাল ও স্থবির আবহাওয়ার কারণে দিল্লিতে দূষণ দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। শিল্পকারখানা, যানবাহনের ধোঁয়া এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানোর কারণে এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
তৃতীয় অবস্থানে থাকা লাহোরের দূষণ স্কোর ছিল ১৬৪। এখানকার বাতাসও অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। শহরটিতে যানবাহনের চাপ, নির্মাণকাজ এবং শিল্প দূষণ বায়ুর মানকে ক্রমাগত খারাপ করছে।
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে কিছুটা ভালো হলেও এখনো উদ্বেগজনক অবস্থাতেই রয়েছে। ঢাকার দূষণ স্কোর ছিল ১২২, যা ‘সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ। বিশেষ করে যারা অ্যাজমা, শ্বাসকষ্ট বা হৃদরোগে ভুগছেন, তাদের জন্য এই বায়ু বিপজ্জনক হতে পারে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। দিনের বিভিন্ন সময়ে ধুলাবালি, যানবাহনের ধোঁয়া এবং নির্মাণকাজের কারণে ঢাকার বায়ুর মান দ্রুত পরিবর্তিত হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকায় বায়ুদূষণের প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে যানবাহনের নির্গত ধোঁয়া, অপরিকল্পিত নগরায়ন, নির্মাণকাজের ধুলা এবং শিল্পকারখানার বর্জ্য। শুষ্ক মৌসুমে এই দূষণ আরও বেড়ে যায়, কারণ বাতাসে ধুলার কণাগুলো দীর্ঘ সময় স্থির অবস্থায় থাকে।
আইকিউএয়ারের সূচক অনুযায়ী, বায়ুর মান সাধারণত ০ থেকে ৫০ এর মধ্যে থাকলে তা ভালো হিসেবে বিবেচিত হয়। ৫১ থেকে ১০০ পর্যন্ত মান মাঝারি বা সহনীয় ধরা হয়। তবে ১০১ থেকে ১৫০ হলে তা সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর হিসেবে গণ্য করা হয়। ১৫১ থেকে ২০০ হলে বাতাস অস্বাস্থ্যকর এবং ২০১ থেকে ৩০০ হলে খুবই অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচিত হয়। ৩০১-এর বেশি হলে তা দুর্যোগপূর্ণ পর্যায়ে পড়ে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করে।
বিশ্বের বড় শহরগুলোর মধ্যে বায়ুদূষণের এই প্রবণতা এখন একটি বৈশ্বিক সংকট হিসেবে দেখা দিচ্ছে। শুধু দক্ষিণ এশিয়াই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন উন্নয়নশীল এবং উন্নত দেশেও বায়ুদূষণ ক্রমাগত বাড়ছে। নগরায়নের দ্রুত বিস্তার, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি এই সংকটকে আরও গভীর করছে।
পরিবেশবিদরা মনে করেন, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ছাড়া কোনো কার্যকর সমাধান সম্ভব নয়। বিশেষ করে গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন, শিল্পকারখানায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নির্মাণকাজে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি গ্রহণ করা জরুরি। একই সঙ্গে নগর এলাকায় সবুজায়ন বাড়ানো এবং গাছপালা সংরক্ষণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ঢাকায় বায়ুদূষণের বর্তমান পরিস্থিতি নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অনেক সময়ই বাতাসে ধুলার ঘনত্ব বেশি থাকে, যা চোখ জ্বালা, কাশি এবং শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। নগর পরিকল্পনায় পরিবেশকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতি বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।
বিশ্বের শীর্ষ দূষিত শহরগুলোর তালিকায় বারবার দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলোর নাম উঠে আসা এই অঞ্চলের পরিবেশগত চ্যালেঞ্জকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে। কাঠমাণ্ডু, দিল্লি, লাহোর এবং ঢাকা—এই চারটি শহরের বর্তমান পরিস্থিতি দেখায় যে বায়ুদূষণ এখন আর শুধু একটি স্থানীয় সমস্যা নয়, বরং একটি আন্তঃদেশীয় সংকট।
বিশ্লেষকদের মতে, সমন্বিত আঞ্চলিক উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যা মোকাবিলা করা কঠিন হবে। পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতা বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ব্যক্তিগত পর্যায়ে ছোট ছোট পদক্ষেপও সামগ্রিকভাবে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
সব মিলিয়ে, আজকের সূচক আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে বায়ুদূষণ এখন বিশ্বের অন্যতম গুরুতর পরিবেশগত হুমকি, যা মোকাবিলায় দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।