পোশাক খাতে পরিবর্তনের ছোঁয়া, তবে শ্রমিক অধিকার প্রশ্নবিদ্ধ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৩ বার
ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়েই বদলেছে পোশাক খাত

প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

 

রানা প্লাজার ভয়াবহ ধসের পর এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। সেই ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারের সাভার বাজার এলাকায় ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনা শুধু বাংলাদেশের নয়, পুরো বিশ্বে তৈরি পোশাক শিল্পের ইতিহাসে একটি বড় কলঙ্ক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এক ভবন ধসে প্রাণ হারান ১ হাজার ১৩৬ জন শ্রমিক, আহত হন আরও কয়েক হাজার মানুষ। সেই ঘটনাই যেন বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

দুর্ঘটনার ধ্বংসস্তূপ থেকে শুরু হয় পুনর্গঠনের পথচলা। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাপ, শ্রমিক সংগঠনগুলোর আন্দোলন এবং বৈশ্বিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসে দেশের তৈরি পোশাক খাতে। আজ সেই শিল্প শুধু অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তিই নয়, বরং পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ কারখানার দিক থেকেও বিশ্বে অন্যতম অবস্থানে পৌঁছেছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন পর্যন্ত ২৮০টির বেশি পোশাক ও বস্ত্র কারখানা লিড সার্টিফিকেশন অর্জন করেছে। এর মধ্যে লিড প্লাটিনাম, গোল্ড ও সিলভার ক্যাটাগরিতে থাকা কারখানাগুলোর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে, যা শিল্পের পরিবেশবান্ধব রূপান্তরের বড় প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

শিল্প মালিকরা বলছেন, রানা প্লাজার পর কমপ্লায়েন্স, বিল্ডিং সেফটি, ফায়ার সেফটি এবং শ্রমিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতা জোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের তদারকিতে হাজার হাজার কারখানায় সংস্কার করা হয়েছে। এখন অনেক কারখানাই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে।

তবে এই অগ্রগতির পাশাপাশি তৈরি পোশাক খাত নিয়ে প্রশ্নও কম নয়। বিশেষ করে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থার ঘাটতি এখনো বড় আলোচনার বিষয় হয়ে আছে। শিল্প উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা নিরাপত্তা ও কমপ্লায়েন্স বিষয়ে যতটা কঠোর, পোশাকের ন্যায্য মূল্য নির্ধারণে ততটা সহায়তা করে না। এতে উৎপাদন খরচ বাড়লেও তার প্রতিফলন রপ্তানি মূল্যে দেখা যায় না, যা শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের জীবনমানের ওপর প্রভাব ফেলে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠনগুলোর মতে, বিশ্বের অনেক দেশে একই ধরনের পণ্য বেশি দামে বিক্রি হলেও বাংলাদেশে মূল্য প্রতিযোগিতার কারণে কম দামে রপ্তানি করতে হয়। ফলে শ্রমিকদের বেতন বাড়ানো ও কল্যাণমূলক ব্যয় নিশ্চিত করা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠনগুলো বলছে, রানা প্লাজার পর যেসব সংস্কারের কথা বলা হয়েছিল, তার অনেকটাই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত হলেও শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা সুবিধা এবং ন্যায্য ক্ষতিপূরণ এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। অনেক দুর্ঘটনার বিচার প্রক্রিয়া বছরের পর বছর ধরে চলমান থাকলেও দ্রুত নিষ্পত্তি হয়নি, যা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য বাড়তি কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শ্রম বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিল্পে উন্নয়ন ঘটলেও শ্রমিকদের মানবিক দিকটি এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। বিশেষ করে দুর্ঘটনার পর ক্ষতিপূরণ প্রদান ও বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা শিল্পের সামগ্রিক বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর প্রশ্ন তোলে।

এদিকে পোশাক খাতের পরিবেশগত উন্নয়নকে আন্তর্জাতিকভাবে ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে। অনেক কারখানা এখন সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করছে, পানি পুনর্ব্যবহার করছে এবং কার্বন নিঃসরণ কমাতে বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এটি বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে নতুন পরিচয়ে বিশ্ববাজারে তুলে ধরছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, রানা প্লাজার ঘটনার পর বাংলাদেশের পোশাক খাত যে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে, তা একদিকে যেমন বড় অর্জন, অন্যদিকে তেমনি একটি চলমান চ্যালেঞ্জও। কারণ টেকসই উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন শ্রমিকের নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি এবং সামাজিক সুরক্ষা একসঙ্গে নিশ্চিত করা যাবে।

শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভবিষ্যতে এই খাতকে আরও শক্তিশালী করতে হলে শুধু রপ্তানি বাড়ানো নয়, বরং মূল্য সংযোজন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং শ্রমিকবান্ধব নীতি বাস্তবায়নের ওপর জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মধ্যে সমন্বয় আরও বাড়ানো জরুরি।

রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপ আজ ইতিহাস হলেও তার শিক্ষা এখনো বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে পথ দেখাচ্ছে। নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব কারখানার দিকে অগ্রগতি নিঃসন্দেহে একটি বড় সাফল্য, কিন্তু শ্রমিক অধিকার ও ন্যায্যতার প্রশ্ন এখনো সেই সাফল্যের পাশে বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়ে গেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত