প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা কমিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে যে কূটনৈতিক আলোচনা আবার শুরু হয়েছিল, তা এখনো কাঙ্ক্ষিত সমঝোতার মুখ দেখেনি। যুদ্ধ বন্ধ বা স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে দুই দেশের অবস্থান আরও স্পষ্ট হলেও, শর্তের জটিলতা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস এই আলোচনাকে বারবার থমকে দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মূল সমস্যা কোনো একক ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নয়। বরং পুরো প্রক্রিয়াটিই ঘুরপাক খাচ্ছে আস্থার সংকট, অতীতের চুক্তি ভঙ্গের অভিজ্ঞতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির কারণে।
এই অচলাবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তি, যা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণের বিনিময়ে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পথ খুলেছিল। আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত সেই চুক্তি ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রশাসন একতরফাভাবে বাতিল করে দেয়। এরপর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক আরও জটিল ও অবিশ্বাসপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেই সিদ্ধান্ত ইরানের কাছে শুধু কূটনৈতিক আঘাতই নয়, বরং ভবিষ্যতের যেকোনো চুক্তির ওপর আস্থার ভিতকেও দুর্বল করে দিয়েছে। ফলে নতুন আলোচনায় তেহরান এখন এমন নিশ্চয়তা চাইছে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো মার্কিন প্রশাসন আবার চুক্তি থেকে সরে না যায়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামোতে এমন স্থায়ী নিশ্চয়তা দেওয়া প্রায় অসম্ভব বলেই মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ওয়াশিংটনের দাবি, ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখছে না এবং গোপন কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ধরনের আচরণই আস্থার সংকটকে আরও গভীর করছে এবং আলোচনার অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
এই পারস্পরিক সন্দেহের কারণে আলোচনার টেবিলে কোনো পক্ষই বড় ধরনের ছাড় দিতে রাজি নয়। ইরান চায় তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিতে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা থাকলেও তার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা দ্রুত ও স্থায়ীভাবে তুলে নেওয়া হোক। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চায় ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিনিময়ে আরও কঠোর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দুই অবস্থানের মধ্যে মূল পার্থক্য হলো সময় ও নিশ্চয়তার প্রশ্ন। ইরান তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক স্বস্তি চায়, আর যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ ও যাচাইয়ের ওপর জোর দিচ্ছে।
এছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্ক আরও উত্তপ্ত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যেও সামরিক বা অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের ঘটনা ঘটেছে, যা বিশ্বাসের ঘাটতিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ফলে আলোচনার প্রতিটি ধাপেই সন্দেহের ছায়া স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
আলোচনায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পরিধি। যুক্তরাষ্ট্র কিছু সীমিত ক্ষেত্রে ছাড় দিতে রাজি হলেও ইরান চায় ব্যাপক ও তাৎক্ষণিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। এই ব্যবধানই সমঝোতার অন্যতম প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, দুই দেশই আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনায় আগ্রহী থাকলেও বাস্তবে কোনো পক্ষই বড় ধরনের রাজনৈতিক ঝুঁকি নিতে চাইছে না। যুক্তরাষ্ট্রে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চাপ এবং ইরানের আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্বেগ এই প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত কোনো চূড়ান্ত চুক্তির সম্ভাবনা নেই। বরং ধাপে ধাপে ছোট ছোট সমঝোতার মাধ্যমে এগোনোর চেষ্টা হতে পারে, যা দীর্ঘ সময় নিতে পারে।
তবে দুই পক্ষই এখনো কূটনীতিকে পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়নি। এটি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ, উত্তেজনা বাড়লেও আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় এই আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক শুধুমাত্র দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর প্রভাব পুরো অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে পড়ছে।
বর্তমান অবস্থায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আস্থার এই গভীর সংকট কি আদৌ কোনো রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব? নাকি দুই দেশের অবস্থান আরও দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থার দিকে যাবে—এই প্রশ্নই এখন আন্তর্জাতিক মহলে সবচেয়ে বেশি আলোচিত।