প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে সরকারি প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির চিত্র। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর অনুসন্ধানে এনবিআরের অতিরিক্ত কর কমিশনার (চলতি দায়িত্ব) কাজী আবু মাহমুদ ফয়সালের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়ার তথ্য উঠে এসেছে, যা তার ঘোষিত আয়ের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে দাবি করা হয়েছে।
দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, ফয়সাল নিজ নামে এবং তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট মোট ১৪ জনের নামে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ অর্জন করেছেন। এই সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১৮ কোটি ১৬ লাখ টাকা বলে জানা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ, ব্যাংক আমানত, সঞ্চয়পত্র এবং শেয়ার বিনিয়োগ।
অভিযোগ অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে এনবিআরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকাকালীন সময়েই তিনি এসব সম্পদ গড়ে তোলেন। বিশেষ করে সেবাপ্রত্যাশীদের ফাইল আটকে রেখে অর্থ আদায় এবং প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে গুরুতরভাবে উত্থাপিত হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে এবং বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, অনুসন্ধানে ফয়সাল ও তার স্বজনদের নামে প্রায় ১৭ কোটি ২১ লাখ টাকার সম্পদের প্রাথমিক তথ্য পাওয়া যায়। পরবর্তী গভীর অনুসন্ধানে সেই অঙ্ক আরও বেড়ে প্রায় ১৮ কোটি ১৬ লাখ টাকায় পৌঁছায়। এই সম্পদের মধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় একাধিক প্লট, ফ্ল্যাট ও জমির অস্তিত্বও পাওয়া গেছে, যা তার ঘোষিত আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফয়সাল ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে প্রায় ২ কোটি ৫৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র রয়েছে। পাশাপাশি ১ কোটি ৭০ লাখ টাকার বেশি শেয়ার বিনিয়োগ এবং প্রায় ৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকার ব্যাংক আমানতের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব অর্থের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে দুদক।
দুদকের একাধিক সূত্র বলছে, অভিযোগ রয়েছে যে ফয়সাল একটি সুপরিকল্পিত আর্থিক জাল তৈরি করে অবৈধ অর্থকে বৈধ করার চেষ্টা করেছেন। তিনি ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের নামে ব্যাংক হিসাব খুলে সেই হিসাবের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তরের মতো প্রক্রিয়া ব্যবহার করেছেন বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগও সামনে এসেছে।
দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, প্রাথমিক অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর আইনগত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা অনুসন্ধানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সম্পদের তথ্য পেয়েছি, যা তার বৈধ আয়ের সঙ্গে মিলছে না। বিষয়টি এখন পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আওতায় রয়েছে।”
এরই মধ্যে দুদকের উপপরিচালক শেখ গোলাম মাওলা বাদী হয়ে ফয়সাল ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় শুধু ফয়সালই নন, তার স্ত্রী আফসানা জেসমিন, শ্যালক, শাশুড়ি, শ্বশুর, ভাই, বোন, মা এবং ঘনিষ্ঠ আত্মীয়সহ মোট ১৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও স্থানান্তরের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
মামলার পর থেকেই বিষয়টি প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। অনেকেই বলছেন, একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব প্রতিষ্ঠানের ভেতরে এমন অভিযোগ রাষ্ট্রীয় আস্থার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। কারণ এনবিআর দেশের রাজস্ব আদায়ের প্রধান প্রতিষ্ঠান, যেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দুদক আরও জানিয়েছে, তদন্তে ফয়সাল ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিংয়ের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ও বিনিয়োগের মাধ্যমে বৈধ আয়ের রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় আর্থিক লেনদেনের একটি জটিল নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছিল বলে ধারণা করছে সংস্থাটি।
এদিকে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগে সাধারণ মানুষের মধ্যেও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, সরকারি দপ্তরে দায়িত্বশীল পদে থেকে যদি কেউ এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকেন, তবে তা প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থা দুর্বল করে দেয়।
অন্যদিকে প্রশাসনিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ঘটনা প্রমাণ করে যে দুর্নীতি দমন ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। বিশেষ করে রাজস্ব, শুল্ক ও কর বিভাগের মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত অডিট ব্যবস্থা জরুরি।
এখন পর্যন্ত ফয়সালের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে মামলার পরবর্তী ধাপে তদন্ত আরও বিস্তৃত হবে বলে জানিয়েছে দুদক। প্রয়োজনে তার ও পরিবারের সদস্যদের সম্পদের আরও গভীর অনুসন্ধান চালানো হবে।
সব মিলিয়ে এনবিআর কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ শুধু ব্যক্তিগত দুর্নীতির গল্প নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় আর্থিক ব্যবস্থার ভেতরের একটি বড় প্রশ্নও তুলে ধরছে। এখন সবার নজর তদন্তের অগ্রগতি ও আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে, যা নির্ধারণ করবে এই অভিযোগের ভবিষ্যৎ পরিণতি।