প্রতিশ্রুতির ভারে চাপা শিল্পী সমিতির বাস্তবতা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৩ বার
মিশা-ডিপজলের নির্বাচনি ইশতেহার

প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচন মানেই বরাবরই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। কখনও তা শিল্পীদের অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতিতে, আবার কখনও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ কিংবা আদালতকেন্দ্রিক নাটকীয়তায়। ২০২৪-২৬ মেয়াদের নির্বাচনেও সেই পরিচিত দৃশ্যের ব্যতিক্রম হয়নি। তবে সেই উত্তেজনার মধ্যেই ‘শিল্পীদের জয় হোক’ স্লোগান সামনে রেখে দায়িত্বে আসে মিশা সওদাগর ও মনোয়ার হোসেন ডিপজল নেতৃত্বাধীন প্যানেল। নির্বাচনের সময় তারা চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়ন, শিল্পীদের কর্মসংস্থান, সংগঠনের ঐক্য এবং পেশাগত মর্যাদা পুনরুদ্ধারের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, মেয়াদ শেষের প্রান্তে এসে তার বাস্তব চিত্র নিয়ে এখন চলছে নানা আলোচনা।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গন দীর্ঘদিন ধরেই সংকটের মধ্যে রয়েছে। সিনেমা নির্মাণ কমে যাওয়া, প্রেক্ষাগৃহ সংকট, নতুন বিনিয়োগের অভাব এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মের উত্থানের কারণে এফডিসিকেন্দ্রিক চলচ্চিত্র সংস্কৃতি আগের মতো প্রাণবন্ত নেই। এই বাস্তবতায় শিল্পী সমিতির নেতৃত্বে আসা নতুন কমিটির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল শিল্পীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং চলচ্চিত্র শিল্পে নতুন গতি সৃষ্টি করা। নির্বাচনি ইশতেহারে মিশা-ডিপজল প্যানেল ঐক্য প্রতিষ্ঠা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, অসচ্ছল শিল্পীদের সহায়তা, সদস্যপদ ও ভোটাধিকার পুনর্বহাল, চিকিৎসা ও আবাসন সুবিধা এবং শিল্পীদের মর্যাদা রক্ষার মতো নানা অঙ্গীকার করেছিল।

দায়িত্ব গ্রহণের পর শুরুতে কমিটির কয়েকটি পদক্ষেপ ইতিবাচকভাবে দেখেছিলেন অনেক শিল্পী। বিশেষ করে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্যানেলের সমর্থকদেরও এক ছাতার নিচে আনার চেষ্টা এবং সমিতির অভ্যন্তরীণ বিভাজন কমিয়ে আনার উদ্যোগকে অনেকে স্বাগত জানান। দীর্ঘদিনের বিরোধ, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং আদালতকেন্দ্রিক টানাপোড়েনের পর শিল্পীদের মধ্যে অন্তত সৌহার্দ্যের পরিবেশ তৈরি হয়েছে—এমন মন্তব্যও করেছিলেন প্রবীণ শিল্পীদের কেউ কেউ।

সমিতির পক্ষ থেকে অসুস্থ ও আর্থিক সংকটে থাকা শিল্পীদের পাশে দাঁড়ানোর কয়েকটি উদ্যোগও আলোচনায় আসে। ঈদ উপলক্ষে সহায়তা বিতরণ, প্রয়াত শিল্পীদের স্মরণসভা আয়োজন এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এফডিসির পরিবেশ সচল রাখার চেষ্টা করা হয়। সমিতির নেতারা দাবি করেন, তারা সংগঠনকে শুধু রাজনৈতিক বা নির্বাচনি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে নয়, বরং একটি পরিবার হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছেন।

তবে এসব মানবিক উদ্যোগের বাইরে শিল্পীদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ছিল কর্মসংস্থান। বাস্তবতা হলো, গত দুই বছরে চলচ্চিত্র নির্মাণের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। হাতে গোনা কয়েকটি ব্যবসাসফল সিনেমা ছাড়া অধিকাংশ সময়ই এফডিসি ছিল অনেকটা নিস্তব্ধ। ফলে জুনিয়র ও পার্শ্বচরিত্রের শিল্পীদের বড় অংশ কাজের অভাবে হতাশায় ভুগেছেন। নির্বাচনি ইশতেহারে সিনেমা নির্মাণ বাড়ানো এবং শিল্পীদের নিয়মিত কাজ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে সে লক্ষ্য পূরণ হয়নি বলেই মনে করছেন অনেকে।

এই ব্যর্থতার পেছনে বিভিন্ন কারণও তুলে ধরছেন সমিতির নেতারা। সভাপতি মিশা সওদাগর একাধিকবার বলেছেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তারা আইনি জটিলতায় পড়েছিলেন। নির্বাচন নিয়ে আদালতে মামলা, প্রশাসনিক টানাপোড়েন এবং দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক অস্থিরতা তাদের কাজের গতি কমিয়ে দেয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতির কারণে সেগুলো পূর্ণতা পায়নি। তবে তিনি মনে করেন, শিল্পীদের মধ্যে বিভেদ কমিয়ে একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করা তাদের বড় অর্জন।

অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক ডিপজলকে ঘিরেও রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। নির্বাচনের সময় নিজের অর্থায়নে চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং শিল্পীদের জন্য কাজের সুযোগ তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বাস্তবে সেই পরিকল্পনার খুব বেশি বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। সমিতির অনেক সদস্যের অভিযোগ, ডিপজল ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে নিয়মিত সময় দিতে পারেননি। যদিও ডিপজল দাবি করেছেন, তিনি ব্যক্তিগত প্রচারের চেয়ে অসহায় শিল্পীদের সহায়তায় বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। তার মতে, সিনেমা শিল্পে নতুন বিনিয়োগ না এলে শুধু সমিতির পক্ষে শিল্পীদের ভাগ্য বদলানো সম্ভব নয়।

সমিতির সহ-সভাপতি মাসুম পারভেজ রুবেলও শিল্পীদের শারীরিক সক্ষমতা ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন। জিমনেসিয়াম আধুনিকায়ন, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং তরুণ শিল্পীদের জন্য কর্মশালার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও দৃশ্যমান বড় কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। অনেকেই মনে করেন, সমিতির কার্যক্রম এখনো মূলত সহানুভূতিনির্ভর; পেশাগত অধিকার আদায়ে শক্ত অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে দুর্বলতা রয়ে গেছে।

তবে সমালোচনার বিপরীতে কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। অনেক প্রবীণ শিল্পী মনে করেন, আগের কয়েক মেয়াদের তুলনায় এই কমিটির সময় এফডিসির পরিবেশ তুলনামূলক শান্ত ছিল। নিয়মিত সাংগঠনিক কার্যক্রম, স্মরণসভা, পুনর্মিলনী এবং শিল্পীদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখার ক্ষেত্রে তারা কিছুটা সফল হয়েছেন। অভিনেত্রী রুনা খানও এক বক্তব্যে বলেন, দীর্ঘদিনের মামলাজট ও বিভক্তির রাজনীতি থেকে সমিতিকে বের করে আনার ক্ষেত্রে বর্তমান কমিটির অবদান রয়েছে।

তবে তরুণ শিল্পীদের একটি বড় অংশ এখনো হতাশ। তাদের মতে, শুধু অনুষ্ঠান আয়োজন বা আর্থিক সহায়তা নয়, সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল নিয়মিত কাজের পরিবেশ তৈরি করা। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, এফডিসিতে শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতি অনিয়মিত ছিল এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডেও গতি কম ছিল। তাদের দাবি, চলচ্চিত্র শিল্পে স্থায়ী পরিবর্তন আনতে হলে শুধু নির্বাচনি স্লোগান নয়, বাস্তবভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প বর্তমানে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে শুধু একটি সংগঠনের উদ্যোগে পুরো পরিস্থিতি বদলে দেওয়া সম্ভব নয়। প্রযোজক, পরিচালক, পরিবেশক, হল মালিক এবং সরকারি নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা কঠিন। তবুও শিল্পী সমিতি শিল্পীদের প্রতিনিধি সংগঠন হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেই জায়গা থেকে শিল্পীদের প্রত্যাশাও থাকে অনেক বেশি।

মিশা-ডিপজল কমিটির মেয়াদ শেষের দিকে এসে তাই মূল্যায়নটা দাঁড়িয়েছে মিশ্র বাস্তবতায়। তারা কিছু মানবিক ও সাংগঠনিক সফলতা অর্জন করলেও নির্বাচনি ইশতেহারের বড় অংশ এখনো অপূর্ণ। বিশেষ করে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, চলচ্চিত্র নির্মাণে গতি আনা এবং পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল আসেনি। ফলে আগামী নির্বাচনকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে—শিল্পীরা এবার কাদের হাতে নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখতে চান।

চলচ্চিত্রপাড়ার অনেকেই এখন মনে করছেন, আগামী দিনের নেতৃত্বকে শুধু জনপ্রিয় মুখ হলেই চলবে না; প্রয়োজন কার্যকর পরিকল্পনা, দীর্ঘমেয়াদি ভিশন এবং চলচ্চিত্র শিল্পকে ঘিরে বাস্তবসম্মত উদ্যোগ। কারণ সিনেমা শুধু বিনোদন নয়, এটি হাজারো মানুষের জীবিকা, সংস্কৃতি এবং দেশের সৃজনশীল পরিচয়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত