“আপনারে বারবার ফোন দিচ্ছি, আপনি কিছু মনে কইরেন না।
একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
আপডেট টাইম :
শুক্রবার, ২৫ জুলাই, ২০২৫
৩৪
বার
প্রকাশ: ২৫শে জুলাই, ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অন্যতম চাঞ্চল্যকর রাজনৈতিক অধ্যায় এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা তাদের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্র-জনতার গণআন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং ছাত্রসংগঠনকে দিয়ে সর্বোচ্চ শক্তি ব্যবহারের ‘খোলা নির্দেশ’ দিয়েছিলেন।
এই প্রতিবেদনে এমন এক ফোনালাপ ফাঁস করা হয়েছে, যা ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই শেখ হাসিনা ও তৎকালীন নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের মধ্যে হয়েছিল বলে দাবি করা হয়। ফোনালাপ অনুযায়ী, ঢাকার রাস্তাঘাট ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে চলমান আন্দোলনের পরিস্থিতি নিয়ে হাসিনা সরাসরি খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং মুলতুবি না রেখে যে যা দরকার তা-ই করার নির্দেশ দিচ্ছেন। ইনান জানান, দলের অন্য সিনিয়র নেতারা সুনির্দিষ্ট নির্দেশ না দেওয়ায় তিনি বারবার হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন এবং অবশেষে ফোনে কথা হয়। ইনান এক পর্যায়ে বলেন, “আপনারে বারবার ফোন দিচ্ছি, আপনি কিছু মনে কইরেন না।” উত্তরে শেখ হাসিনা বলেন, “না, আমি কেন মনে করবো। আমি সারারাতই জাগা, কালকেও তো।”
আল জাজিরা দাবি করে, এই ফোনালাপসহ অন্যান্য অডিও উপাত্ত জাতীয় টেলিযোগাযোগ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র (NTMC) সংগ্রহ করেছে এবং এগুলোর ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণ সম্পন্ন হয়েছে, যা তাদের প্রতিবেদনে যুক্ত করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেখ হাসিনা ফোনে ইনানকে বলেন, “দক্ষিণে-উত্তরে বলে দিয়েছি, যেখানে যা দরকার তাই করতে,” যা একপ্রকার অসীম ও নিরঙ্কুশ শক্তি ব্যবহারের পরোক্ষ অনুমোদন হিসেবে প্রতীয়মান। ইনান উত্তরে জানান, “আমাদের নেতাকর্মীরা মাঠেই ছিল, আপনার নির্দেশনা পাইয়াই সবাই নাইমা গেছে।”
এই ফোনালাপের প্রেক্ষাপট ছিল আন্দোলনের আগের ঘটনা। ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের সাথে ছাত্রলীগের যৌথ অভিযানে সাধারণ ছাত্রদের ওপর যে নিপীড়ন চালানো হয়, তা দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ ও প্রতিবাদের জন্ম দেয়। এই ঘটনার ২ দিন পরেই শেখ হাসিনা ও ইনানের এই কথোপকথন হয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ ইতোমধ্যে এই অভিযোগের ভিত্তিতে শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিচার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
বিচার কার্যক্রমের শুরুতে প্রাক্তন আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন আদালতে হাজির হয়ে নিজের দায় স্বীকার করে রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানা গেছে। আদালতের ভাষ্য অনুযায়ী, মামুনের স্বীকারোক্তি মামলার গুরুত্ব ও প্রকৃতি এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই ধরনের ফোনালাপ এবং রাষ্ট্রীয় শক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের নির্দেশ শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরেই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এক গভীর উদ্বেগ ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি চূড়ান্ত অবহেলা এবং ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে নিষ্ঠুর দমননীতি অনুসরণের যে অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ছিল, এই ডকুমেন্টরি তার দৃঢ় প্রমাণ হতে পারে।
বর্তমানে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। গণআন্দোলনের চাপে গত বছরের শেষদিকে তিনি প্রধানমন্ত্রী পদ ছাড়েন এবং দেশের বাইরে চলে যা
এই মামলার বিচারিক কার্যক্রম ও আল জাজিরার তথ্য-প্রমাণ ভবিষ্যতে দেশের রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে চলছে বিস্তর আলোচনা। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ ঘটনার আন্তর্জাতিক তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে এবং জাতিসংঘকেও এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার অনুরোধ জানিয়েছে।
আল-জাজিরার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন।
এখন দেশবাসীসহ আন্তর্জাতিক মহল তাকিয়ে আছে বাংলাদেশের এই বহুল আলোচিত ও জটিল রাজনৈতিক ও মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট মামলার বিচারিক পরিণতির দিকে। কারণ এটি শুধু একটি মামলার বিচার নয়—এটি একটি দেশের গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও নৈতিকতার পরীক্ষাও।