প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন গতি আনতে যাচ্ছে আগামি আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহ। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, এই সময়ের মধ্যেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা করতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। গণ–অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি ঘিরেই এ ঘোষণা আসবে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা দিতে পারেন।
সরকার চাইছে, ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে—রমজান মাস শুরু হওয়ার আগেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। এই লক্ষ্যেই নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে অনুরোধ জানানো হবে। নির্বাচনকালীন সমন্বয় এবং রাজনৈতিক পরিবেশ অনুকূলে রাখতে সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
৫ আগস্টের মধ্যেই রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতিতে আলোচিত “জুলাই সনদ” প্রকাশের সম্ভাবনাও এখন অনেকটাই নিশ্চিত। এই সনদই হতে যাচ্ছে একটি যুগান্তকারী রূপরেখা, যেখানে আগামী নির্বাচনকে ঘিরে দলগুলোর অঙ্গীকার, সংস্কার এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মূল রূপরেখা নির্ধারিত হবে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ইতোমধ্যে এই সনদের একটি খসড়া প্রস্তুত করেছে, যা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পাঠানো হবে।
এই খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কিছু নতুন প্রস্তাব, যার মধ্যে রয়েছে—স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগে সম্পন্ন করা, সংসদ নির্বাচনে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি (PR) চালুর দাবি ইত্যাদি। তবে এসব প্রস্তাব নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বিএনপি। দলটির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা মনে করছেন, এসব অতিরিক্ত শর্ত নির্বাচন বিলম্বিত করার কৌশল হতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বাধীন চলমান সংলাপ এবং জাতীয় ঐকমত্য গঠনের প্রচেষ্টা ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিয়েছে। ১৩ জুন লন্ডনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস। ওই বৈঠকে আলোচনার ভিত্তিতে এক যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচন আয়োজন সম্ভব, যদি প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক প্রস্তুতি ও বিচারসংক্রান্ত সংস্কারে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জিত হয়।
তবে লন্ডন বৈঠকের পর সরকারি পর্যায় থেকে নির্বাচন কমিশনকে আনুষ্ঠানিক বার্তা না দেওয়ায় বিএনপির মধ্যে একধরনের অনিশ্চয়তা ও সন্দেহ তৈরি হয়েছিল। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, এই অনিশ্চয়তা নিরসনে এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশ তৈরিতে সরকারকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
এরই মধ্যে ২২ জুলাই থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে তিন ধাপে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সর্বশেষ ২৬ জুলাই ১৪টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে বৈঠকে বসেন প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস। বৈঠক শেষে জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার সাংবাদিকদের বলেন, “প্রধান উপদেষ্টা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, আগামী চার থেকে পাঁচ দিনের মধ্যেই নির্বাচনসংক্রান্ত সময়সীমা ও তারিখ ঘোষণা করা হবে।” তিনি আরও বলেন, “বর্তমান অরাজকতা থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হচ্ছে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, সেটি সরকার এখন বুঝতে পেরেছে।”
সতর্ক কূটনৈতিক কৌশলের মধ্য দিয়ে সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা অর্জনে কাজ করছে। আলোচনায় এমন প্রস্তাবও উঠে এসেছে যে, নির্বাচন সংক্রান্ত ঘোষণা এবং সনদ দুইটি যেন পরস্পরকে পরিপূরক করে। যাতে করে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক রূপরেখা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে কোনো সাংঘর্ষিক দ্বন্দ্ব তৈরি না হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এখনো সময় আছে—সরকার যদি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক রোডম্যাপ ঘোষণা করে এবং নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতাকে বাস্তবে সম্মান জানায়, তাহলে এক নতুন রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে উঠতে পারে, যা শুধুই জাতীয় নির্বাচন নয়, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নবজাগরণ হিসেবেও বিবেচিত হবে।
এই মুহূর্তে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ এবং সমঝোতার যে আবহ তৈরি হয়েছে, তা ধরে রাখা অত্যন্ত জরুরি। কারণ অতীতে বারবার দেখা গেছে, নির্বাচন সামনে এলেই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভাজন এবং অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তোলে। অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, ঘোষণার প্রতিটি ধাপ যেন বিশ্বাসযোগ্য এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করে।
আগামী কয়েক দিন দেশের রাজনীতিতে দিকনির্দেশক হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণার মাধ্যমে দেশ একটি চূড়ান্ত পর্যায়ের দিকে এগিয়ে যাবে—যেখানে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীলতা, রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের ভিত্তিতে।
একটি বাংলাদেশ অনলাইন