প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য পুরনো “জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা”। প্রাথমিক স্তরের বৃত্তি পরীক্ষার পুনঃচালুর সিদ্ধান্তের পর এবার শিক্ষা মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিয়েছে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্যও বাছাইকৃত ভিত্তিতে বৃত্তি পরীক্ষা আয়োজনের। প্রায় সাত মাস পেরিয়ে যাওয়া চলতি শিক্ষাবর্ষেই এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ইতিমধ্যেই এ নিয়ে উচ্চপর্যায়ের একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে পরীক্ষাটি আয়োজনের বিষয়ে নীতিগত আলোচনা হয়েছে। যদিও এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি, তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রক্রিয়া অগ্রসরমান রয়েছে এবং কয়েক দিনের মধ্যেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা আসতে পারে।
প্রস্তাবিত এই বৃত্তি পরীক্ষায় জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষার মতো সব শিক্ষার্থী অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে না। পরিবর্তে, নির্ধারিত সংখ্যক বাছাইকৃত শিক্ষার্থীকে পরীক্ষার জন্য মনোনীত করা হবে, যা নিয়ে শিক্ষা মহলে এবং অভিভাবক সমাজে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও বিতর্ক।
শিক্ষাবিদদের একাংশ মনে করছেন, এই ধরণের বাছাই ভিত্তিক পরীক্ষার ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য আরও ঘনীভূত হতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো হয়তো শুধুমাত্র মেধাবী বা বাছাইকৃত শিক্ষার্থীদের প্রতি মনোযোগ দেবে, ফলে অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়বে এবং ঝরে পড়ার হার বাড়তে পারে। একইসঙ্গে কোচিং ও প্রাইভেট নির্ভরতা বৃদ্ধি পেয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ এবং অভিভাবকদের ওপর অর্থনৈতিক চাপও বাড়াবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ স্পষ্টভাবে মন্তব্য করেছেন, “শিক্ষার সার্বিক মানোন্নয়নের জন্য বৃত্তি পরীক্ষা সহায়ক নয়। এই পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষকেরা নির্দিষ্টসংখ্যক শিক্ষার্থীর ওপর মনোযোগী হবেন, অন্যদের প্রতি অবহেলা হতে পারে।”
অন্যদিকে, কিছু শিক্ষানীতিবিদ ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা এই উদ্যোগকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন। তাঁদের মতে, পরীক্ষাটি শুধুমাত্র প্রতিযোগিতার সুযোগ নয়, বরং মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য এক ধরনের উৎসাহব্যবস্থা হিসেবেও কাজ করবে। তবে তাঁরা একমত যে, শুধুমাত্র পরীক্ষাই মেধা যাচাইয়ের একমাত্র পথ হতে পারে না; বরং বিদ্যালয় পর্যায়ে সামগ্রিকভাবে শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক ব্যবস্থা গ্রহণ করাই বেশি জরুরি।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, “জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে সিদ্ধান্ত হলে দ্রুত তা জানিয়ে দেওয়া হবে।”
উল্লেখ্য, ২০১০ সালের আগ পর্যন্ত অষ্টম শ্রেণিতে পৃথকভাবে জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়া হতো। পরে এই পরীক্ষার জায়গা নেয় জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষা। জেএসসি পরীক্ষায় দেশের সব অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করত এবং সেখান থেকেই বৃত্তিপ্রাপ্তদের বাছাই করা হতো। তবে এই পরীক্ষার কারণে অতিরিক্ত কোচিং, টিউশনি এবং প্রাইভেট নির্ভরতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পায়, যার ফলে শিক্ষায় ব্যবসায়িকীকরণের প্রবণতা ব্যাপক হয়। ২০২০ সালে করোনা মহামারির কারণে জেএসসি পরীক্ষা বাতিল করা হয় এবং পরবর্তী সময়েও তা আর চালু হয়নি।
বর্তমানে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের প্রেক্ষাপটে শিক্ষা ব্যবস্থায় যেসব সংস্কার আনা হচ্ছে, তার মধ্যে এই বৃত্তি পরীক্ষার বিষয়টি নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অনেকেই বলছেন, শিক্ষার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সকল শিক্ষার্থীর সামগ্রিক বিকাশ, পরীক্ষা নির্ভর নয়।
ফলে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সামনে এখন একদিকে যেমন শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের স্বীকৃতি প্রদান, অন্যদিকে পরীক্ষাভিত্তিক বৈষম্য এবং কোচিং নির্ভরতার নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলার দ্বৈত চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়ে আছে।
একটি বাংলাদেশ অনলাইন