ম্যানহাটনে রক্তাক্ত সকাল, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত পুলিশসহ নিহত ৫, নিউইয়র্কে বন্দুকধারীর হামলায় শোকের ছায়া

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৯ জুলাই, ২০২৫
  • ৯৮ বার

প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন

যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ব্যস্ত মহানগর নিউইয়র্ক শহরের প্রাণকেন্দ্র ম্যানহাটনে ঘটে গেল এক হৃদয়বিদারক ও মর্মান্তিক ঘটনা। স্থানীয় সময় সোমবার সকালে একটি ভয়াবহ বন্দুক হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন পাঁচজন, যার মধ্যে রয়েছেন একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত পুলিশ কর্মকর্তা। নিহত পুলিশ কর্মকর্তার নাম দিদারুল ইসলাম। বয়স মাত্র ৩৬। তাঁর স্ত্রী ছিলেন গর্ভবতী। এই করুণ ঘটনায় পুরো নিউইয়র্কজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ঘটনা এবং প্রতিক্রিয়া এখন দেশ-বিদেশের সংবাদমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।

ঘটনাটি ঘটে নিউইয়র্ক শহরের ম্যানহাটনের ৩৪৫ পার্ক এভিনিউ ও ইস্ট ৫১তম স্ট্রিট সংলগ্ন এলাকায়। সকালে অফিসগামী মানুষের ব্যস্ত সময়ে এক বন্দুকধারী হঠাৎ করেই গুলি চালাতে শুরু করে। হামলায় প্রথমেই লক্ষ্য হন ডিউটিরত পুলিশ কর্মকর্তা দিদারুল ইসলাম, যিনি হামলার সময় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টায় নিয়োজিত ছিলেন। নিউইয়র্ক সিটির মেয়র এরিক অ্যাডামস এক সংবাদ সম্মেলনে নিশ্চিত করেন, “দিদারুল ইসলাম ছিলেন দায়িত্বশীল, সাহসী ও আদর্শ পুলিশ সদস্য। তিনি মানুষের জীবন রক্ষার জন্য আত্মনিয়োগ করেছিলেন। আমরা একজন সত্যিকারের নায়ককে হারালাম।”

 

ঘটনার পরপরই নিউইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্ট (NYPD) ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায় এবং এলাকাটি ঘিরে ফেলে। একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্যমতে, হামলাটি ছিল আচমকা এবং তীব্র গতির। মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। গুলির শব্দে চমকে ওঠেন পথচারী ও কাছাকাছি অফিসে থাকা শত শত মানুষ। গুলিবর্ষণের ফলে ঘটনাস্থলেই নিহত হন আরও তিনজন নিরীহ বেসামরিক ব্যক্তি।

পুলিশ কমিশনার জেসিকা টিসচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে জানান, “ঘটনাস্থলে পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। সন্দেহভাজন বন্দুকধারীকে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। সে ঘটনাস্থলেই মারা গেছে।” প্রাথমিকভাবে পুলিশের ধারণা, হামলার পর নিজেই নিজের অস্ত্র দিয়ে আত্মহত্যা করেছে ওই বন্দুকধারী। তবে তার পরিচয় এখনো প্রকাশ করা হয়নি, এবং হামলার মোটিভ নিয়ে তদন্ত চলছে।

এনবিসি নিউজ এবং নিউইয়র্ক টাইমস সহ একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, এই ঘটনার কোনো আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনের সম্পৃক্ততার তথ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। যদিও পুলিশ সব সম্ভাবনাই খতিয়ে দেখছে। ঘটনাস্থলে পাওয়া গেছে একটি আধুনিক স্বয়ংক্রিয় রাইফেল ও কিছু গোলাবারুদ, যেগুলো ফরেনসিক বিশ্লেষণের জন্য পাঠানো হয়েছে।

বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যেও দিদারুল ইসলামের মৃত্যু গভীর শোক ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। নিউইয়র্কে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা তাঁর আত্মত্যাগকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মসূচির আয়োজন করছেন। এক কমিউনিটি নেতার ভাষায়, “দিদারুল শুধু একজন পুলিশ সদস্য ছিলেন না, তিনি আমাদের গর্ব, প্রেরণা। তিনি নিউইয়র্ক শহরের নিরাপত্তার জন্য প্রাণ দিয়েছেন। এই আত্মত্যাগ আমরা ভুলব না।”

নিউইয়র্ক প্রশাসন ইতোমধ্যে নিহতদের পরিবারকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। মেয়র এরিক অ্যাডামস বলেন, “শহরের পক্ষ থেকে নিহত দিদারুল ইসলামের পরিবারকে সব ধরনের সাহায্য দেওয়া হবে। আমরা নিশ্চিত করব, তাঁর পরিবারের পাশে আমরা আছি।”

সার্বিকভাবে এই ঘটনা আবারো যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক সহিংসতা এবং জননিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একটি নিরাপদ শহরের অভ্যন্তরে এমন দুঃসাহসিক হামলা নতুন করে নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইনের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

 

নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগ জানিয়েছে, তারা ঘটনাটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে এবং এর নেপথ্যে যদি কোনো বৃহৎ ষড়যন্ত্র থাকে, তা উদ্ঘাটনে তৎপরতা অব্যাহত থাকবে। এদিকে প্রবাসী বাংলাদেশি সংগঠনগুলোও সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছে—দিদারুল ইসলামের মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও তাঁর পরিবারের যথাযথ সহায়তা নিশ্চিত করা হোক।

এই মর্মান্তিক ঘটনার প্রেক্ষিতে নিউইয়র্কবাসী আজ শুধু একটি পুলিশ কর্মকর্তাকেই হারায়নি, বরং হারিয়েছে একজন সৎ, সাহসী ও মানবিক হৃদয়ের মানুষকে—যিনি নিজের জীবন দিয়ে অন্যের জীবন বাঁচাতে চেয়েছিলেন। তার এই আত্মত্যাগ বহুদিন স্মরণে থাকবে, কেবল নিউইয়র্কবাসীর নয়—প্রবাসী বাংলাদেশিদের হৃদয়েও।

একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত